আপনার কবরের জীবন কেমন হবে?| মৃত্যুর পরের জীবন | life in the grave

779

আমরা প্রতিদিন ঘুম উঠে পর স্বপ্নের জগতকে ঝাপসা আর বাস্তব জগতকে চরম সত্য বলে  মনে হয়। ঠিক তেমনি মৃত্যুর পর আপনার জীবনের পুরো সময়টা স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে। যা আপনি ঘুমের মাধ্যমে অতিবাহিত করেছেন। আপনার সাথে ফেরেশতাদের ঘটে যাওয়া অলৌকিক সব অভিজ্ঞতার পর আপনি আপনার কবরে ফিরে এসেছেন। আপনার কবরের জীবন কেমন হবে আসুন তা একটু দেখে নেই। আপনি কবর থেকে শুনতে পাচ্ছেন আপনার আপনজনেরা কবর দেওয়া শেষ করে আপনার জন্য দোয়া ও জিকির করছে। তারা আপনাকে ছেড়ে যেতে চাচ্ছে না। একটা চরম সত্য আমরা সবাই জানি, তাদেরকে যেতে হবেই। কারণ প্রতিটি মানুষকে জীবনের বাস্তবতায় নিজ নিজ পথ পারি দিতে হবে। কবর দেওয়া শেষ করে চলে যাওয়া শেষ মানুষটিরও পায়ের আওয়াজ আপনি কবর থেকে শুনতে পান। তারপর নিস্তব্ধ কিছু সময় পার হয়ে গেল নাকি সারা দিন তা আপনি বুঝতে পরলেন না। কারণ কবরের জগতে সময়ের হিসেব করা বড়ই কঠিন। হঠাৎ আপনি অনুভব করলেন  আপনার কবরটি ছোট আসছে । একি কবরের মাটি দুপাশ থেকে আপনাকে চেপে ধরছে। আপনি চিৎকার দেওয়ার আগেই দুপাশের মাটির চাপে আপনার দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। এরপর কবরের মাটি আপনাকে ছেড়ে দিল।

 

আপনি ভাবছেন, এটা কি কবরের আজাব ছিল? আমি কি তাহলে শাস্তি পাওয়া মানুষগুলোর দলে?

ঠিক তখনই রাসূল (সাঃ) সেই কথাগুলো আপনার মনে পড়ে গেল। তিনি বলেছিলেন,  কেউ যদি কবরের মাটি আযাব থেকে বাঁচতে পারত তবে সে হতো সাদ ইবন মু’আয (রঃ)। সাদ ইবন মু’আয (রঃ) মৃত্যুতে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছিল । ৭০ হাজার ফেরেশতা পৃথিবীতে নেমে এসেছিল সাদ ইবন মু’আয (রঃ) এর জানাজায় শরিক হতে । সেই সাদ ইবন মু’আয (রঃ) কেউ কবরের মাটি চেপে ধরেছিল কারণ এটায় আল্লাহ সুবহানা তাআলার হুকুম। তাহলে একটু ভাবুন তো আপনার কবরের জীবন কেমন হবে ?

এরপরই আপনা কেউ উঠিয়ে বসানো হলো।  আপনার সামনে দেখতে খুব ভয়ঙ্কর দুজন ব্যক্তি হাজির হলো । তারা হলেন কবরের ফেরেশতা মুনকার আর নাকীর। তারা কাউকে সান্ত্বনা দিয়ে নম্রভাবে কথা বলে না। তাদের প্রধান দায়িত্ব আমাদের ঈমান ও আমলের পরীক্ষা করা। কোন অজুহাত দেওয়ার কোন সুযোগ নেই তাদের কাছে।

# আপনাকে কাছে এসে প্রশ্ন করল, মান রাব্বুক অর্থাৎ তোমার রব কে?

তাদের ভয়ঙ্কর চেহারা দেখে আপনি ভেবেছিলেন আপনি হয়ত কিছুই বলতে পারবেন না কিন্তু আপনি সারা জীবন যে আল্লাহকে বিশ্বাস করেছেন, আদেশ পালন করার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন, তাকে অমান্য করার পরও তার কাছে ক্ষমা চেয়ে সিজদা করেছেন সেই মহান আল্লাহর সুবহানা তাআলার পরিচয় জানতে চাওয়ার পর আপনি কি করে চুপ থাকেন? আপনার মস্তিষ্কের অপেক্ষা না করেই আপনার ঠোট আর জিহবা উত্তর দিল, আমার রব আল্লাহ।

# এরপর তারা আপনাকে প্রশ্ন করল, ওমান দিনুক অর্থাৎ তোমার দিন কোনটা?

আপনি তাদের বললেন, আমার দ্বীন ইসলাম

# সবশেষে তারা আপনাকে প্রশ্ন করল,  তোমার কাছে যাকে পাঠানো হয়েছিল তার ব্যাপারে তুমি কী বলো?

সেই মানুষটির নাম বলতে গিয়ে আপনার মুখে হাসি ফুটে উঠল। আর আপনি বললেন তিনি হচ্ছেন, মহান আল্লাহর বান্দা তার প্রেরিত রসূল । আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার  বান্দা এবং তাঁর রসূল। ঠিক তখনই তারা বলে উঠলো, সাদাক্ত অর্থাৎ তুমি সত্য বলেছ এবং সাথে সাথে আপনার কবরটা প্রসারিত হতে থাকে। আস্তে আস্তে আপনার কবরটি অনেক বড় হয়ে যায়। তারপর আপনার সামনে একটি চিত্র তুলে ধরা হয় এটা কি কোন ভিডিও নাকি এর চাইতেও আধুনিক কোন প্রযুক্তি যা আপনার জানাও নেই আবার ভাবার সুযোগও নেই। সেখানে দেখানো হচ্ছে ভয়ানক জায়গা, চারিদিকে দাও দাও করে আগুন জ্বলছে এবং হিংস্র সব জীব করও জন্য অপেক্ষা করছে যা আপনি অবাক হয়ে দেখতে লাগলেন। আপনাকে বলা হল যদি গাফেল হয়ে  মহান আল্লাহর আদেশ অমান্য করে আপনার জীবন কাটিয়ে দিতেন তাহলে আজ আপনাকে এই স্থানে থাকতে হত। আপনি কি ভাবতে পারছেন কতই ভয়ঙ্কর  আপনার কবরের জীবন কেমন হবে বা হতে পারত। এরপর অন্যদিক থেকে আরেকটি চিত্র তুলে আপনাকে দেখানো হলো এবং   আপনার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য আপনি দেখতে পেলেন । এতই মনোরম সেই দৃশ্য যা দেখে  অনায়াসে মাসের-পর-মাস কাটিয়ে দেওয়া যায়। এরপর তারা আপনাকে বলল এটাই হবে আপনার সর্বশেষ আবাসস্থল। আর  এটাই  জান্নাতের সেই ঘর, যার জন্য আল্লাহ সুবহানা তাআলা আপনাকে সৃষ্টি করেছেন এবং অতিশীঘ্রই আপনি সেখানে ফিরে যাবেন।

এই মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে আপনার কবরের জীবনের অধ্যায় শুরু হয়ে গেল। কোন আক সময় আপনার আত্মীয় স্বজনেরা আপনার সাথে দেখা করতে আসবে। যারা আপনাকে ছেড়ে অনেক আগেই না ফেরার দেশে চলে এসেছিল। আপনি কল্পনা কারতে পারেন যে, কতই না সুখকর হবে সেই মিলন। যে মা,বাবা , নানা-নানী, দাদা-দাদীকে বহু বছর আগে আপনি কবর দিয়েছিলেন কবরের (মারযাখের) জীবনে এসে তাদের সাথে আপনার আবার সাক্ষাৎ হবে । তারা দুনিয়ার জীবনের সকল খবর জানতে চাইবে তারা আপনার সাথে দুনিয়ার নানা বিষয় নিয়ে গল্প করবে। গল্প করতে করতে এক সময় তারার আপনার এক বন্ধুর কথা উঠে যায়। আর তারা বলবে, আমুক কেমন আছে?  আপনি অবাক হয়ে তাদের বলেন অমুক্ তো আরো তিন বছর আগেই মারা গেছে। কেন তোমরা কি তার দেখা পাওনি?

তখন তারা সবাই চুপ হয়ে যায়। তারা সবাই বুঝতে পারে আপনার সেই বন্ধুটি ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারেনি তাই সে কবরের আজাব থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেনি। যে ব্যক্তি ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারলো না, সে ব্যক্তির আযাব মৃত্যু থেকে শুরু করে জাহান্নাম পর্যন্ত চলতে থাকে।  তার এই পরিস্থিতি ক্রমাগতভাবে খারাপ হতে থাকে। তাকে যখন আসমান থেকে কবরে ছুড়ে ফেলা হয় ও কবরের মাটি তাকে হিংস্রভাবে চেপে ধরে। মাটির চাপে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এরপর মুনকার-নাকির এসে যখন তাকে উঠিয়ে বসায় আর প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে, “মান রাব্বুক” সে আমতা আমতা করতে থাকে আর কোন উত্তর দিতে পারে না। তাকে জিজ্ঞাস হয়, মা দিনুক” এবার ও সে আমতা আমতা  করতে থাকে ।  তাকে আবার প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম কে নিয়ে, সে রাসূল (সাঃ) সম্পর্কে কি জানে? সে এই উত্তরটিও ঠিকভাবে দিতে পারেনা বরং বলতে থাকে আমি লোকের কাছে এই এই শোনেছিলাম। এরপর মুনকার-নাকির তাকে বলবে, তুমি মিথ্যা বলেছ।

এবার তার মাথায় শক্ত লোহা দিয়ে অনেক জোরে আঘাত করা হবে ।   তার চিৎকার মানুষ আর জীন ছাড়া আশেপাশের প্রতিটি সৃষ্টি শুনতে পাবে। এরপর তাকে জান্নাতের দৃশ্যটি দেখিয়ে বলা হবে, মহান আল্লাহর আহবানে সাড়া দিলে এটাই হতো তার সঠিক গন্তব্য। তারপর তাকে জাহান্নামের দৃশ্যটি দেখিয়ে বলা হবে, মহান আল্লাহর আদেশ অমান্য করে তুমি নিজেই নিজের জন্য এই গন্তব্যটি বেছে নিয়েছে। জাহান্নামে তার জন্য শাস্তি অপেক্ষা করছে আর জান্নাতে গেলে সে কি পেতে পারতো সেই দৃশ্য দেখার পর তার মনে যে অকল্পনীয় অনুতাপ সৃষ্টি হয় যদি সে কোনো শাস্তির নাও পেত তবে সে শুধু সেই অনুতাপটাই তার জন্য আযাব হিসেবে অসহনীয় হয়ে পরত। তবে আলহামদুলিল্লাহ্‌  আপনার সে গন্তব্য হয়নি । আপনি শুয়ে আছেন চির প্রশান্তির সেই প্রশস্ত কবরে। শুধুমাত্র আপনার মহান রবের অসীম রহমতের জন্যই আপনার কবর আজ জান্নাতের উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত । এবং চির সুখময় নিবাসে আপনি সেই দিন টির জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন, যে দিন শেষ বিচারের জন্য সবাইকে একটি ময়দানে একত্রিত করা হবে । কিন্তু আপাতত একটু চির শান্তির নিবাসে বিশ্রাম নেয়া যাক।