একটি তাওয়াক্কুলের গল্প । modernislam

1091
19 Shares

 একটি তাওয়াক্কুলের গল্প

বৃহস্পতিবার সকাল ১১:৩০ মিনিট। এই সময়টির কথা আমি জীবনেও ভুলতে পারব না। কারণ, তখন আমি মানসিকভাবে প্রচণ্ড একটি ধাক্কা খাই। সিস্টারদের একজন এসে জানায় যে, গত মঙ্গল ও বুধবার আড়াই বছর বয়সী যে-বাচ্চাটির ওপর অস্ত্রোপচার করেছিলাম, তার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বন্ধ হয়ে গেছে। সংবাদ পেয়ে তৎক্ষণাৎ আমি বাচ্চাটির কাছে ছুটে যাই। তাকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিটের একটি কার্ডিয়াক মাসাজ দিই।
এই দীর্ঘ সময়ে তার মধ্যে উন্নতির কোনাে লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে সবাই তাকে মৃত বলে ধরে নেয়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ইচ্ছেয় তার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসে। আমরা আল্লাহ রব্বল আলামীনের শুকরিয়া জানালাম।

বাচ্চাটির সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানোর জন্য আমি তার পরিবারের খোঁজ নিই। একজন মানুষের জীবন-মৃত্যু যখন দোদুল্যমান থাকে তখন সে অবস্থা নিয়ে তারই আপনজনের সাথে আলোচনা করা অত্যন্ত কষ্টকর। এক্ষেত্রে একজন ডাক্তারকে দুই কষ্টের মাঝখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সেতু নির্মাণ করতে হয়—যেন একটির ভাঙনের শব্দে অপরটি ভেঙে না পড়ে।

অনেক খোঁজাখুজির পর আমি বাচ্চার মায়ের সন্ধান পাই। তাকে জানাই যে, বাচ্চার গলার ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এটাই তার হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ। কিন্তু এই রক্তক্ষরণ কেন হচ্ছে—সে-বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। সম্ভবত তার মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কী মনে হয়—এ কথার উত্তরে একজন মা কী বলতে পারেন?

তার কি কান্নায় ভেঙে পড়ার কথা?
তার কি আমার প্রতি অভিযোগ উত্থাপন করার কথা?

হ্যাঁ, এগুলাে করাটাই তার জন্য স্বাভাবিক ছিল; কিন্তু তিনি এসব না-করে কেবল “আলহামদুলিল্লাহ’ বলে চলে যান। ১০দিন পর বাচ্চাটি আবার নড়াচড়া করতে শুরু করে। আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করি। শিশুটির মস্তিষ্কের কার্যক্রমও বেশ স্বাভাবিক মনে হতে থাকে। কিন্তু ১২ দিন পর সেই একই রক্তক্ষরণে তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া আবারও বন্ধ হয়ে যায়। আবারও আমরা তাকে পৌনে একঘণ্টার সেই কার্ডিয়াক মাসাজ দিই; কিন্তু এবার আর তার হার্ট রেসপন্স করছে না। আমি তার মাকে জানাই যে, এবার আর বাবুটার বাঁচার তেমন কোনো আশা নেই।

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, হে আল্লাহ, যদি তার সুস্থতায় কোনো কল্যাণ নিহিত থাকে তবে তাকে তুমি সুস্থ করে দাও। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যেন সাথে-সাথেই মায়ের দুআ কবুল করলেন। শিশুটির হৃদযন্ত্র চলতে শুরু করে।

এই একই ঘটনা পর-পর ছয়বার ঘটে এবং প্রতিবারই মনে হয় যে, এখানেই হয়তো শেষ। অতঃপর আল্লাহ তাআলার ইচ্ছেয় একজন বিশেষজ্ঞ সার্জন তার এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে সক্ষম হন। এরপরে তার হার্ট পুরাপুরি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে থাকে। এভাবে সাড়ে তিন মাস অতিবাহিত হয়।

এই তিন মাসে শিশুটি যদিও ক্রমান্বয়ে আরোগ্য লাভ করছিল; কিন্তু তার ভেতরে নড়াচড়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। তারপর, একদিন সে ধীরে-ধীরে নড়তে শুরু করে। কিন্তু হঠাৎ করে তার মস্তিষ্কের উপরিভাগে বৃহদাকারে একটি ঘা দেখা দেয়। ক্ষতস্থানটি দূষিত রক্ত ও পুঁজে পরিপূর্ণ ছিল। আমি এরকম অদ্ভুত জিনিস আগে কখনও দেখিনি। আমি তার মাকে এই অবস্থার কথা জানালে তিনি পুনরায় ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বলে চলে যান। আমরা যত দ্রুত সম্ভব তাকে সার্জিক্যাল ইউনিটে নিয়ে যাই। সেখানে ব্রেইন এবং নার্ভাস সিস্টেমের ওপর সকল ধরনের জটিল চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করা হয়।

একটি তাওয়াক্কুলের গল্প

আমরা তাকে সেখানে ভর্তি করি। তিন সপ্তাহ পরে ছেলেটি আরােগ্য লাভ করলেও অসাড় হয়ে পড়ে থাকে। দুই সপ্তাহ পর তার দেহে আরও একটি অদ্ভুত লক্ষণ প্রকাশ পায়। তার রক্তে একপ্রকার বিষক্রিয়া দেখা দেয় এবং তার শরীরের তাপমাত্রা ১০৬ ডিগ্রিতে পৌঁছে। আমি আবারও তার মাকে রক্তের এই বিপদজনক বিষক্রিয়া সম্পর্কে অবগত করি এবং তিনি যথারীতি অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে সব শােনেন এবং বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। হে আল্লাহ, যদি তার আরোগ্য লাভের মধ্যে কোনো কল্যাণ নিহিত থাকে তবে তাকে তুমি সুস্থ করে দাও।’
শিশুটিকে পরিদর্শন করে আমি পাশের বেডের আরেকটি শিশুকে দেখতে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি–তার মা চিৎকার করে কাঁদছে। আমাকে দেখে তার বিলাপেরমাত্রা আরও বেড়ে যায়। ডাক্তার! ও ডাক্তার!! আমার ছেলেকে বাঁচান!!! একটা কিছু করুন প্লী-ই-জ। আমার ছেলে তাে মরে গেল-ও-ও!’ |

তার ছেলে জ্বরে কাতরাচ্ছিল এবং তার টেম্পারেচার ছিল ৯৯.৬৮ ডিগ্রি। আমি খুব আশ্চর্যান্বিত হয়ে তাকে বলি, আপনার পাশের বেডের বাচ্চাটির জ্বর ১০৬ ডিগ্রি। তবুও তার মা কত ধৈর্যশীল এবং তিনি তারপরেও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলার প্রশংসা করছেন।

উত্তরে উত্তেজিত মহিলা বলেন, ওই মহিলা তার বাচ্চার প্রতি উদাসীন! তাছাড়া ওই মহিলা খানিকটা অপ্রকৃতিস্থও বটে।সেই মুহূর্তে আমার রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেই বিখ্যাত হাদীসটি কথা মনে পড়ে যায়—
Blessed are the strangers
মাত্র দুটি শব্দ…কিন্তু ওয়াল্লাহি! এই দুটি শব্দই পারে পুরো একটি জাতিকে পরিবর্তন করতে।

আমার ২৩ বছরের ডাক্তারি জীবনে আমি এরকম ধৈর্যশীল কোনো মাকে আজ পর্যন্ত দেখিনি। যাই হােক, আমরা তার ছেলেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও যত্নের সাথে চিকিৎসা ও সেবা দিতে থাকি। এভাবে সাড়ে ছয় মাস অতিবাহিত হবার পর অবশেষে শিশুটিকে সেই রিকোভারি ইউনিট থেকে বের করে আনা হয়। নীরব-নিথর, মূক ও বধির ছেলেটির মুখে অভিব্যক্তির কোনো চিহ্নও নেই। তার উন্মুক্ত বক্ষ দেশে তাকালে দেখা যায় কেবল—তার ছােট্ট হৃদয়ের ধুকপুকানি। ছেলেটির মা প্রতিদিন সন্তানের ক্ষতস্থান যত্নসহকারে ড্রেসিং করেন। তার ভেতরে নিরাশার কোনাে ছাপ কখনই দেখা যায় না।

আপনি কি এর পরের ঘটনা অনুমান করতে পারেন?

যে-শিশুটির জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এমন ভয়াবহ মরণব্যাধির আক্রমণে জর্জরিত, তার ব্যাপারে আপনি হলে কতটুকু আশাবাদী হতেন?

শিশুটির মায়ের এই প্রতিনিয়ত উৎকণ্ঠা ও দীর্ঘ যন্ত্রণায় পথপরিক্রমাকে আপনার কাছে কী মনে হয়? আপনি হলে এক্ষেত্রে কতটা শক্ত থাকতে পারতেন?

আপনার ধৈর্যের বাঁধ কতটা মজবুত করে গড়ে তুলতে পারতেন?

এমন পরিস্থিতিতে মহান রবের কাছে দুআ করা ছাড়া শিশুটির মায়ের আর কোনাে উপায়-ই ছিল না; কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, রবের কাছে দু’হাত তুলে দুআ করাকে তিনি ‘অগত্যা কী আর করা হিসেবে নেননি; বরং মােটেই নিরাশ না হয়ে অটল বিশ্বাস এবং সবরের সাথে বারংবার তার সন্তানের জন্য দুআ করে গেছেন।
আপনি কি জানেন, এর আড়াই মাস পরে কী ঘটেছিল?

ছেলেটির মায়ের এই অত্যাশ্চার্য ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা-গুণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অবশেষে ছেলেটিকে সম্পূর্ণরূপে রোগমুক্ত করে দেন।

বাবুটি এখন তার মায়ের সাথে ছুটোছুটি করে। দৌড়াদৌড়ি করে। দেখে মনে হয়, যেন সে কখনই অসুস্থ ছিল না।
.
প্রিয় পাঠক, ঘটনা এখানেই শেষ নয়। ঘটনার যে-অংশটি আমার হৃদয়কে আলোড়িত করেছে, আমার বুক ভেঙে চৌচির করে দিয়েছে সে-অংশটুকুই এখন আপনাকে বলবো “ছেলেটি হাসপাতাল ত্যাগ করেছে প্রায় দেড় বছর। এরই মধ্যে একদিন অপারেশন ইউনিটের ওয়ার্ডবয় আমাকে জানায় যে, একজন ভদ্রলােক সস্ত্রী-সন্তানসহ আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন। তারা কে জানতে চাইলে—সে বলে, “চেনে না।
.
আমি আর কোনো প্রশ্ন না-করে তাদের সাথে দেখা করতে যাই। গিয়ে দেখি—দেড় বছর আগে যে শিশুটির অপারেশন করেছিলাম, তারই মা-বাবা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।

ছেলেটির বয়স এখন পাঁচ বছর। শান্ত-শিষ্ট ও দুর্দান্ত। তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে, তার জীবনে ভয়ানক সেই দিনগুলাে কখনও হানা দিয়েছিল। তাদের সাথে চার মাস বয়সী আরেকটি শিশুও ছিল।

আমি তাদের সাদর সম্ভাষণ জানালাম এবং কৌতূহলবশ তভদ্রলােককে জিজ্ঞেস করলাম, এটি তার তের বা চৌদ্দতম সন্তান কি না?

তিনি একটু বিব্রত ভঙ্গিতে হাসলেন। অতঃপর বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, এটি আমাদের দ্বিতীয় সন্তান। আর কিছুদিন আগে আপনি যার অপারেশন করেছেন, সে-ই আমাদের প্রথম সন্তান। দীর্ঘ সতের বছর নিঃসন্তান থাকার পর আল্লাহ আমাদের প্রথম সন্তান দান করেন।

একথা শুনে আমি নিজেকে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। কান্নায় ভেঙে পড়লাম। অতঃপর, আমি তার হাত জড়িয়ে ধরে আমার রুমে এনে বসালাম।

তার স্ত্রী সম্পর্কে জানতে চাইলাম, “কে এই মহিয়সী নারী—যিনি দীর্ঘ সতের বছর নিঃসন্তান থাকার পরেও প্রথম নবজাতকের ক্রমাগত জীবন-মরণ সংকটে শান্ত-অবিচল থাকতে পেরেছেন?

যে-পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের; বিশেষত নারীদের, চিৎকার ও বিলাপ করে সবকিছু একাকার করে ফেলার কথা তিনি তখনও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রশংসা করেছেন আর সন্তানের আরোগ্যলাভের জন্য কেবল তাঁরই ওপর আস্থা রেখেছেন এবং তাঁরই কাছে দুআ করেছেন? এটি কীভাবে সম্ভব?’

এর উত্তরে তিনি কী বললেন, জানেন?

তিনি বললেন— ‘আমাদের বিয়ের বয়স উনিশ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে তাকে কোনো রাতে তাহাজ্জুদের সালাত বাদ দিতে দেখিনি। [শুধু নারীদের প্রকৃতিগত সমস্যার দিনগুলাে ব্যতীত]

কখনও কারও গীবত করতে শুনিনি এবং কখনই তাকে মিথ্যা বলতে দেখিনি। তাছাড়া আমি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এবং ঘরে ফেরার সময় প্রতিবার সে দরজা খুলে হাসিমুখে আমায় বিদায় ও স্বাগত জানায়। আমার জন্য দুআ করে। সে যা-কিছু করে—তার প্রতিটি।

কাজে থাকে পরম যত্ন, বিনয় ও ভালােবাসার কোমল পরশ। ডাক্তার সাহেব, আমি তার প্রতিটি আচরণে এত বেশি মুগ্ধ যে, সব সময় মনে হয়, আমি তার যােগ্য নই। সেজন্য তার চোখে চোখ তুলে তাকাতে খুব লজ্জা লাগে।

আমি স্মিত হেসে বললাম, এমন একজন গুণবতী নারীর ভাগ্যে আপনার মতােই একজন স্বামী থাকা দরকার। এটি তিনি ডিজার্ভ করেন।
.
বিঃ দ্রঃ কার্ডিওভাসকুলার কনসালট্যান্ট প্রফেসর আলিদ আল-জুবায়ের তার একটি লেকচারে ঘটনাটি তুলে ধরেন।

লিখেছেনঃ- মাহমুদুর রহমান