কবীরা গুনাহ ও মুনাফেকির নিদর্শন সংক্রান্ত হাদিস ও তার ব্যাখা – ১ম পর্ব

কবীরা গুনাহ ও মুনাফেকির নিদর্শন

জমহুর ওলামায়ে কেরাম ও তার পুর্ব ও পরের আলেমদের মতে পাপ কে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে, বড় পাপ ও ছোট পাপ। তাই আজ কবীরা গুনাহ নিয়ে কুরআন ও হাদিসের যে ব্যাখ্যা সমূহ আছে তা নিয়ে আলোচনা হবে।

এ বিষয়ে পবিত্র কুরআন এর সূরায় নিসা’র ৩১ নং আয়াতে এবং সূরায় আন নাজম এর ৩২ নং আয়াতে বিস্তারিত বর্ননা করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) এর মতে কবীরা ঐ সমস্ত গুনাহ যেগুলোর ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌ তায়ালা গযব, অভিশাপ, জাহান্নাম এবং আজাবের কথা বলেছেন। তবে অগ্রাধিকার যোগ্য অভিমত হলঃ কবীরা ঐ সমস্ত পাপা বা গুনাহ যেগুলোর ক্ষেত্রে জাহান্নাম, গযব, অভিশাপ এবং আজাবের কথা বলা হয়েছে। এবং এই গুনাহ যার দ্বারা সম্পাদিত হয় তাকে ফাসেক বলা হয়।

কবীরা গুনাহ, kabira gunah

কবিরা গুনাহ এর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে যা বলা হয়েছেঃ

  • আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেনঃ তোমরা যদি নিষিদ্ধ কবিরা গুনাহ পরিহার কর তবে আমি তোমাদের ছোট গুনাহ (সগীরা গুনাহ) সমূহ ক্ষমা করে দিব। (সুরাহ আন নিসা, আয়াত – ৩১)

 

  • আল্লাহ্‌ তায়ালার বানীঃ যারা কবীরা গুনাহ বা অশ্লীল কাজ থেকে বেঁচে থাকে সগীরা গুনাহ ব্যাতিরকে। (সূরা আন – নাজম, আয়াত – ৩২)

কবিরা গুনাহ এর ব্যাপারে হাদিসঃ

kabira gunah hadis

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রা) থেকে বর্নিত তিনি বলেন এক লোক রাসুল (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর কাছে সর্বাধিক বড় গুনাহ কোনটা? রাসুল (সাঃ) বললেন, তোমাকে জিনি সৃষ্টি করেছেন সেই আল্লাহর সাথে কাওকে শরীক করা।

অতঃপর পুনরায় জিজ্ঞেস করল এরপর কোনটা? তোমার সন্তান তোমার সাথে খাবে এই ভয়ে তাকে হত্যা করা।

পুনরায় জিজ্ঞেস করল এরপর কোনটি? তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়া। তিনি (ইবনে মাসুদ (রা) বলেন) এই ব্যাপারে আল্লাহ্‌ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন যে, “তারাই আল্লাহর প্রকৃত বান্দা যারা আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কাউকে মাবুদ হিসেবে গন্য করেনা, আল্লাহ্‌ যাদের হত্যা করা নিষেধ করে দিয়েছেন আইনের বিধান ছাড়া অন্যায় ভাবে তাকে হত্যা করা, এবং ব্যাভিচার না করা। আর এগুলো করার ফলে সেই শাস্তির সাক্ষাৎ লাভ করবে” ( সুরাহ আল – ফুরকান, আয়াত – ৬৮)

হাদিসের ব্যাক্ষা

এই হাদিস দ্বারা আমরা খুব সহজে বুঝতে পারছি যে, একক আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করা পৃথিবীর জঘন্য কাজ। এরপর রাসুল (সা) বললেন যে, স্বীয় আদরের সন্তান কে এই কারনে হত্যা করা যে সে তার সাথে খাবে। বিনা কারনে হত্যা করা কে একটি জঘন্য ও নিকৃষ্ট কাজ এর সাথে আল্লাহ্‌ তায়ালা গন্য করেছেন।

এবং এই হত্যার সাথে নিজের সন্তান কে যুক্ত করা কদর্জ যুক্ত অপরাধ বলে সাব্যস্ত হয়। এই হাদিস টি উক্ত আয়াতের সমার্থক। “দরিদ্র হবার ভয়ে তোমরা স্বীয় সন্তান কে হত্যা করোনা” ( সুরাহ বানী ইসরাইল, আয়াত – ৩১) “তোমার প্রতিবেশীর সাথে ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়া” এই বাক্যের ব্যাখায় ইমাম নাবী বলেন,

এর মর্মাথ হল তার সম্মতিক্রমে তার সাথে ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়া। এতে ব্যাভিচারের সাথে আরো দু’টি অপরাধ যুক্ত রয়েছে। সে ঐ মহিলা কে তার স্বামীর বিরুদ্ধে বিগরিয়ে দিয়েছে এবং তার অন্তর কে ব্যাভিচারের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। এই কাজ দু’টি আরো জঘন্য। এই কাজ এম্নিতেই জঘন্য, তার উপরে প্রতিবেশীর সাথে করা আরো জঘন্য। কেননা সকল প্রতিবেশী আশা করে যে, সেই তার প্রতিবেশীর জন্য ঢাল স্বরূপ থাকবে। তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকবে, তার থেকে নিরাপদ থাকবে। আর তাকে তো আদেশেই দেয়া হয়েছে, সে প্রতিবেশী কে দয়া প্রদর্শন করবে, তাকে সম্মান করবে।

এবং পরিশেষে বলা যায় যে, সে যদি এই সবের পরিবর্তে তার স্ত্রীর সাথে ব্যাভিচার করে তার স্ত্রীকে তার বিরুদ্ধে বিগরিয়ে দেয় তখন তা অপরাধের শেষ সীমানায় পোছাবে।

কবীরা গুনাহ hadis

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) তিনি বলেন রাসুল (সা) বলেছেনঃ কাউকে আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, কাউকে হত্যা করা, মিথ্যা শপথ করা বড় গুনাহ।

ব্যাখ্যা

আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন করার মর্মার্থ হলঃ আল্লাহ্‌ ব্যাতিরকে অন্য কাউকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করা।

এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল কুফরি করা।

পিতা মাতার অবাধ্য হওয়া এই কথার মর্মার্থ হল তাদের আদেশ অমান্য করা এবং তাদের সেবা না করা।

অর্থাৎ এমন কোন কাজ সন্তানের দ্বারা সম্পাদিত হওয়া যাতে সন্তানের জন্য পিতা-মাতা কষ্ট না পায়। অন্যায় করে কাউকে হত্যা করা, মিথ্যা বলা, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা এগুলো হচ্ছে কবিরাহ গুনাহের মধ্যে অন্যতম। আল্লাহ্‌ আমাদের এর থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুক।

পরিশেষে বলা যায় যে, আমরা গুনাহ করতে করতে জতই ক্লান্ত হয়ে যাই না কেন আল্লাহর কাছে আমাদের ক্ষমা চাওয়ার পথ সর্বদা খোলা রয়েছে। কোন বান্দা যদি একটি বার চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় তবে আল্লাহ্‌ তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবেন। তাই উক্ত হাদিস অনুযায়ী আল্লাহ্‌ তায়ালা আমাদের সর্বদা ঈমানের সাথে চলার তোউফিক দান করুক।

এবং সর্বদা আমাদের শয়তানের ধোঁকা ও পাপা কাজ থেকে বিরত রাখুন।

আমিন

হাদিস রেফারেন্স

১ম হাদিস- সহিহঃ  বুখারি – ৬৮৬১, ও মুসলিম – ৮৬

২য় হাদিস, সহিহঃ বুখারি – ৬৬৭৫

 

 

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here