কালেমা তৈয়বা শরীফের ফজীলত | দুরুদ শরীফের ফজীলত

দুরুদ শরীফের ফজীলত

পরকালের সম্বল পর্ব – ১

কালেমা তৈয়বা শরীফের ফজীলত

কালেমা তৈয়বা শরীফের ফজীলত

প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু দারদা (রা) নবী করিম (সা) এর এরশাদ বর্ননা করেন – যখন বান্দা ঈমান আনার লক্ষ্যে কালেমা শরীফ অর্থাৎ – ‘লা–ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ উচ্চারন করেন, তখন তাঁর মুখ থেকে গাঢ় সবুজ বর্ণের দু’টি পাখির বেশে দু’জন ফেরেশতা বের হয়ে আসেন। এদের দুটি পাখা এতো বড় যে তা মাশরিক ও মাগরিব পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে জেতে সক্ষম। এই ফেরেশতা দু’জন ঊর্ধ্বজগতে আরশের নিচে পৌঁছে যায়। তাঁদের মুখ থেকে মধু-মক্ষিকার আওয়াজের ন্যায় গুন-গুন আওয়াজ বের হতে থাকে। আরশে-আজিমে বিদ্যমান ফেরেশতাগণ এই দুই আগন্তুক ফেরেশতা কে বলতে থাকেন, চুপ হউ! আল্লাহ্‌ রাব্বুল ইজ্জতের মহা-পরিক্রমের প্রতি লক্ষ্য করে আওয়াজ বন্ধ কর! তখন আগন্তুক দুই ফেরেশতা বলেন, আল্লাহ্‌ রাব্বুল ইজ্জত যে পর্যন্ত কালেমা শরীফ পাঠকারী বান্দার সমস্ত গুনাহ মাফ করে না দেন, সে পর্যন্ত আমরা চুপ হতে পারিনা।

তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে, নিঃসন্দেহে আমি কালেমা “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” পাঠকারী কে ক্ষমা করে দিয়েছি।

অতঃপর আল্লাহ্‌ জাল্লাহ শানহু উক্ত দুই ফেরেশতাদের কে সত্তুর হাজার যবান দান করেন, যে কোন দুটি জবান দ্বারা যে দু’টি যবান দ্বারা এরা কেয়ামত পর্যন্ত কালেমা শরীফ পাঠকারী বান্দার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে।

কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার পর এই দুই ফেরেশতা কালেমা শরীফ পাঠকারী বান্দার নিকট হাজির হয়ে হাত ধরে তাকে ‘পুলসিরাত’ পার করে দিবেন।

দুরুদ শরীফের ফজীলত

হযরত আবদুল্লাহ তারালেকি (রহ) বর্ণনা করেন- ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ বাক্যটির মধ্যে ২৪ টি হরফ রয়েছে এবং রাত-দিন ২৪ ঘন্টায় বিভক্ত। যখন কোন বান্দা নিষ্ঠাপুর্ন অন্তরে কালেমা শরীফ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ উচ্চারন করে তখন আল্লাহ্‌ জাল্লা শানহুর পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে, ‘হে আমার বান্দা! তুমি যে কালেমা শরীফ পাঠ করলে এর মধ্যে চব্বিশটি রয়েছে। রাত এবং দিনে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে তুমি প্রকাশ্যে জেনে না জেনে, মুখের কোথায় বা কাজে, ছোট-বড় যেসব গুনাহ করেছ কালেমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ এর ইজ্জতে প্রতি লক্ষ্য করে তোমার সে সব গুলো গুনাহ আমি ক্ষমা করে দিলাম।

হযরত নবী করীম (সা) এরশাদ করেছেন, পুর্ববতী নবীগণের মধ্য থেকে কোন একজনের নিকট এই মর্মে অহী প্রেরন করা হয়েছিল যে, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ বাক্যটি আমার দুর্গবিশেষ ! যে ব্যক্তি এই দুর্গে প্রবেশ করবে সে দোযখের আগুন থেকে নিরাপদ হয়ে যাবে।

বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সা) একদা কিছু লোক কে লক্ষ্য করে বলেছেলেন, তোমারা ‘ঢাল’ এর ব্যবস্থা কর। সাহাবীগন আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! শত্রু প্রতিহত করার ঢাল? বললেন, না। জাহান্নামের আগুন প্রতিহত করার ঢাল কিরুপ হতে পারে? বললেন, “সুবহানাল্লাহি ওয়ালহামদুলিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবর। ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম !

আবি মাকনা ইমাম ইয়ালার (রা) বর্ণনা উদবৃদ্ধ করে বলেন, একদা তিনি আরজ করেছিলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাঃ)! লোকেরা সদকা করে পুর্ন অর্জন করে থাকে কিন্তু আমার নিকট সদকা দেয়ার মত কোন কিছু নেই।

তবে আমি ‘সুবহানাল্লাহ ওয়ালহামদুলিল্লাহ ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবর ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম’ পড়ে থাকি। একথা শুনে হযরত নবী করীম (সাঃ) এরশাদ করেছিলেন ‘এই বাক্য গুলি নিয়মিত পাঠ করা মিসকিনদের মধ্যে এক মন স্বর্ণ সদকা করার চাইতেও বেশী পুণ্যের কাজ।

রাসুল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, দু’টি বাক্য সুবাহানাল্লাহি ওয়া বিহামদেহি ওয়া সুবহানাল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম ওয়া বিহামদেহী’ মুখে উচ্চারন করা নিতান্ত সহজ তবে নেকির পাল্লায় অত্যাধিক বেশি ওজন বিশিষ্ট। এবং আল্লাহর নিকট প্রিয়।

হাদিস শরীফে আরো বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি প্রতিদিন ‘একশ বার ‘সুবহানাল্লাহি ও্যা বিহামদিহী’ পাঠ করে তাঁর জীবনের সমস্ত গুনাহ আল্লাহ্‌ পাক ক্ষমা করে দিবেন। এই গুনাহ সমুদ্রের পানির বরাবর হলেও!

bangla hadis

দুরুদ শরীফের ফজীলত

হাদিসে বর্ণিত আছে, আল্লাহ্‌ পাক এরশাদ করেছেন, ‘বিশ্ব চরাচরে জতো মুসলমান আছে, তাঁদের মধ্য থেকে যে কেউ আমার প্রিয় নবীর প্রতি যদি একবার দুরুদ শরীফ পাঠ করে তবে আমি মালিক স্বয়ং এবং আমার ফেরেশতাগণ  সে ব্যক্তির প্রতি দশবার দুরুদ প্রেরন করে থাকি।

উল্লেখ্য যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে দুরুদ প্রেরণের অর্থ হল রহমত দান করা। আর ফেরেশতাগণের পক্ষ থেকে দুরুদ প্রেরণের অর্থ আল্লাহ্‌ তায়াল্র নিকট সে ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।

হযরত নবী করীম (সাঃ) এরশাদ করেছেন, প্রতিটি দোয়ার উর্ধধজগতে একটি পর্দার সম্মুখীন হয়। হুজুর (সাঃ) এবং তাঁর আল-আওলাদের প্রতি দুরুদ পাঠের সমন্বয়ে দোয়া করলে সেই পর্দা সরে গিয়ে দোয়া কবুল হওয়ার স্থান পর্যন্ত পৌঁছে যায়। যে দোয়ার পর দুরুদ শরীফ পড়া হয় না সেই দোয়া দুনিয়ার দিকে ফিরে আসে।

রাসুল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, আমার ওফাতের পর অ তোমাদের মধ্য থেকে জেই ব্যক্তি আমার প্রতি সালাম পাঠ করবে, তৎক্ষণাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ) এই মর্মে সংবাদ পৌঁছে দেন যে, ইয়া রাসুলাল্লাহ! অমুকের পুত্র আপনার বরাবরে সালাম প্রেরন করেছে; তখন আমি বলব, ওয়া আলাইকাসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ!

রাসুল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, আল্লাহপাক দু’জন ফেরেশতা নিয়োজিত করে রেখেছেন যেন কোন মজলিসে বা কারো স্মানে আমার নাম উচ্চারিত হলে শ্রবণকারীরা আমার প্রতি দুরুদ প্রেরন করে। তখন দুই জন ফেরেশতা এই মর্মে দোয়া করেন যে, আল্লাহ্‌পাক তোমাদের ক্ষমা করে দিন। এই দোয়ার সাথে সাথে অন্য ফেরেশতাগন আমিন বলতে থাকেন।

হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, কোন কাগজের ওপর যদি আমার আমার প্রতি দুরুদ শরিফ লিখিত হয়, তবে যে পর্যন্ত লিখাটি অবশিষ্ট থাকে সে পর্যন্ত ফেরেশতাগণ লেখকের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতে থাকেন।

মৃত্যুর পর লোকেরা ইমাম শাফেয়ী (রহ:) কে স্বপ্ন দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে ইমামুল মুসলিমিন! আল্লাহ্‌পাক আপনার সাথে কিরুপ ব্যবহার করেছেন? বলেছিলেন, আল্লাহ্‌পাক আমাকে মাদ করে দিয়েছেন। জিজ্ঞেশা করা হল, কোন পুণ্যের জন্য আপনার এই সৌভাগ্য হয়েছে? পাঁচটি বাক্যের একখানা দুরুদ শরীফ আমি পাঠ করতাম। সেই দুরুদের বরকতেই আল্লাহ্‌পাক কোন হিসাব না নিয়েই আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।

দুরুদের সেই বাক্য গুলা হচ্ছে, ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ বিআদাদে মান সাল্লা আলাইহি, ওয়া সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন বিমা তুহিব্বু ওয়া তারজা আন ইউসাল্লি আলাইহি। ওয়া সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন বিমা তুহিব্বু ওয়া তারজা আন ইউসাল্লি আলাইহি ওয়া সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন কামা আমারতানা বিসসালাতে আলাইহি’।

আমিরুল মুমিনিন হযরত ওসমান (রাঃ) বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি প্রতি জুমাবারে রাসুল (সাঃ) এর প্রতি একশত বার দুরুদ শরীফ পাঠ করবে, হাশরের দিন আল্লাহ্‌ পাক সেই বান্দা কে এই পরিমাণ নূর দান করবেন, যা দুনিয়ার সকল মানুষকে প্রদত্ত নূরের অর্ধেক পরিমাণ হবে।

হাদিস শরীফে আছে, যে ব্যক্তি জুমাবারে হযরত নবী করীম (সাঃ) এর বরাবরে একশত বার দুরুদে হাদিয়া প্রেরণ করবে, আল্লাহ্‌পাক তাঁর সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবেন। যদি তাঁর গুনাহ সমুদ্রের পানির বরাবর ও হয়!

হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, হযরত নবী করীম (সাঃ) এরশাদ করেছেন, জুমার দিন যে ব্যক্তি আমার প্রতি একশতবার দুরুদ প্রেরণ করবে, আল্লাহপাক তাঁর একশ টি প্রয়োজন মিটাবেন। এর মধ্যে ৭০ টি দুনিয়ার প্রয়োজন ও ৩০ টি আখিরাতের।

আল্লাহুম্মা সাল্লি ওয়া সাল্লিম আলা সাইয়্যেদেনা মাওলানা মুহাম্মাদ।

লেখক পরিচিতিঃ

মূল ভাবনাঃ  হযরত শায়খ শরফুদ্দিন আহমাদ ইয়াহইয়া মানিরি (রহঃ)

অনুবাদঃ মরহুম মাওঃ মহিউদ্দিন খান

(সাবেক সম্পাদক মাসিক মদিনা, ঢাকা)

আর্টিকেল টি লিখেছেন ও ধারাবাহিক ভাবে লিখে যাবেন – হাফেজ মাওঃ মোঃ আবদুল্লাহ আল রায়হান

(প্রিন্সিপাল – দারুল কুরআন মডেল মাদ্রাসাহ,পঞ্চগড়)

 

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here