তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূহ | Modern Islam

383
তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূহ
তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূহ

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূহ

                   আহমদ বদরুদ্দীন খান

                  সম্পাদক : মাসিক মদীনা

প্রথমেই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন- যা চিরদিনের জন্য হয়ে থাকে। ইসলামী শরীয়তে অস্থায়ী-বিয়ের কোন অনুমতি নেই।

তাই একটি বিবাহ বৈধ হতে হলে শরীয়ত যে চারটি শর্তারোপ করেছে তন্মধ্যে একটি হলো

“আজীবন একত্রে সংসার যাপন করার উদ্দেশে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া।” পবিত্র কোরআনে এ মর্মে বলা হয়েছে :

وَأُحِلَّ لَكُم مَّا وَرَآءَ ذَٰلِكُمۡ أَن تَبۡتَغُواْ بِأَمۡوَٰلِكُم مُّحۡصِنِينَ غَيۡرَ مُسَٰفِحِينَۚ (سُورَةُ النِّسَاءِ : ٢٤)

অর্থাৎ, “ঐ সকল স্ত্রীলোক ছাড়া বাকী স্ত্রীলোকদের যৌন স্পৃহা মেটানোর উদ্দেশে নয় বরং চিরদিনের জন্য মোহরের বিনিময়ে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার শর্তে তোমাদের জন্য বিবাহ করা বৈধ।” (সূরা আন নিসা : ২৪)

এ আয়াতে একথা একেবারে স্পষ্ট যে, একটি বিবাহ আজীবনের জন্যই সম্পন্ন হতে হয়। যার দরুন একটি বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে মোটেই কাম্য নয়।

তাই ইসলাম তালাক দেওয়ার নির্দেশ কখনও দেয়নি বরং একান্ত প্রয়োজনে তালাক দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে মাত্র। তা-ও আবার নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী এবং শর্ত সাপেক্ষে।

এরপরও ‘তালাককে’ ইসলামী শরীয়তে নিকৃষ্টতম বৈধ কাজ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

যেমন সুনানে আবু দাউদে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা.) এরশাদ করেছেন :

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى الطَّلَاقُ

(رَوَاهُ أَبُوْ دَاوُدُ فِيْ كِتَابِ الطَّلَاقِ : ٢١٧٨)

অর্থাৎ, “বৈধ কাজগুলোর মধ্যে আল্লাহ্ তাআলার কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম কাজ হলো ‘তালাক।’ (সুনানে আবু দাউদ : ২১৭৮, সুনানে ইবনে মাজাহ্ : ২০১৮)

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে : “আল্লাহ্ তা’আলা যমিনের মধ্যে তালাকের চেয়ে অধিক নিকৃষ্ট কোন বস্তু সৃষ্টি করেননি।

” সুনানে ইবনে মাজায় হযরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এরশাদ করেন :

عَنْ ثَوْبَانَ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ্রأَيُّمَا امْرَأَةٍ سَأَلَتْ زَوْجَهَا الطَّلَاقَ فِي غَيْرِ مَا بَأْسٍ، فَحَرَامٌ

عَلَيْهَا رَائِحَةُ الْجَنَّةِ (رَوَاهُ أَبُوْ اِبْنُ مَاجَة فِيْ كِتَابِ الطَّلَاقِ : ٢٠٥٥)

“যে স্ত্রীলোক তার স্বামীর কাছে বিনা কারণে তালাক চাইবে তার জন্য জান্নাতের সুগন্ধ পর্যন্ত হারাম হয়ে যাবে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ্ : ২০৫৫, সুনানে আবু দাউদ : ২২২৬, সুনানে তিরমিযী : ১১৮৭)

অতএব তালাক থেকে দূরে থাকতে এভাবেই পবিত্র ইসলাম নারী-পুরুষ তথা স্বামী-স্ত্রী উভয়কে সতর্ক করে দিয়েছে।

উল্লেখিত আলোচনা দ্বারা একথা সুস্পষ্ট যে, একটি বিবাহ সর্বাবস্থায় আজীবন অটুট থাকাই মহান স্রট্রার একান্ত অভিপ্রায় এবং ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে একান্ত কাম্য, তবে যখন

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে চরম মতানৈক্য দেখা দিবে, সংসার জীবন বিষময় হয়ে উঠবে, কোন মতেই আর একত্রে থেকে সংসার যাপন করা যাবে না, অথচ সমাধানের সকল চেষ্টা ব্যর্থ

হয়ে যাবে, তখন ইসলাম অনিবার্য প্রয়োজনের তাগিদে তালাকের অনুমতি দিয়ে বলেছে :

“একান্ত প্রয়োজনের তাগিদেই তালাককে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে।” (সহীহ্ বোখারী, কিতাবুত তালাক)

তালাকের আবশ্যকতা : মানুষের পারিবারিক জীবনে বিবাহ যেমন অতি প্রয়োজনীয় একটি অনুসঙ্গ ঠিক তেমনি তালাকের আবশ্যকতাও অনস্বীকার্য।

স্বামী-স্ত্রীর মনের অমিলে যদি তারা পরস্পর শান্তিতে সংসার যাপন করতে অপারগ হয়, এমতাবস্থায় একত্রে থাকলে যদি সংসার বিষময় হয়ে উঠে, সংসারে যদি স্থায়ী অশান্তি দেখা দেয়, সংসার যদি জাহান্নামের রূপ নেয় তাহলে একে অন্যের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় আর অবশিষ্ট থাকে না। আর যদি এ অবস্থায়ও পরস্পর পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কোন ব্যবস্থা না থাকে তাহলে সংসারে অশান্তির আগুন জ্বলবে, পরিবার ধ্বংস হবে। তন্মধ্যে কেউ হয়ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিবে, নয়ত একে অন্যকে প্রাণে মারতে উদ্যত হবে।

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

তাছাড়া এ ঝগড়া শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পরিবারের ছেলে-মেয়ে থেকে শুরু করে অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে।

আর শুধু এখানেই শেষ নয়, বরং উভয় পক্ষের মধ্যে এর বিরূপ প্রভাবে সমাজেও অশান্তির দাবানল ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই পর্যায়ে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়াই মঙ্গল। এসব অশান্তি, অঘটন ও অমানবিক কর্মকাণ্ড থেকে ব্যক্তি, পরিবার তথা সমাজকে রক্ষা করার স্বার্থে স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের থেকে স্বসম্মানে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার যে সুযোগ পবিত্র ইসলাম দিয়েছে তারই নাম হলো- ‘তালাক।’

অবস্থা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্ষেত্র বিশেষে যার আবশ্যকতা অস্বীকার করার উপাই নেই। এহেন ব্যবস্থা না থাকলে সময়ে সুযোগে কত যে অঘটন ঘটতে পারে তা বলাই বাহুল্য।

যেখানে এহেন ব্যবস্থা নেই সেখানে এভাবে কত যে অঘটন ঘটছে তার হিসেব কে রাখে? তাই বুঝে শুনেই ইসলাম বিশেষ ক্ষেত্রে কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে এর অনুমতি দিয়েছে।

তালাক আশীর্বাদ না অভিশাপ : প্রথমেই জানা প্রয়োজন যে, ইসলাম যখন তখন, যেমন খুশি তেমনভাবে তালাক দেওয়ার অনুমতি দেয় নাই।

এক্ষেত্রে রয়েছে অবস্থাভেদে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিস্তারিত বিধি-বিধান। স্বামী-স্ত্রীর মতের কিংবা মনের অমিল হলেই অথবা তাদের মধ্যে ঝগড়া লেগে গেলেই তালাক দিয়ে দেওয়ার কথা ইসলামে নেই।

যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয় কিংবা স্ত্রী যদি কোন অপরাধই করে থাকে- তবে সঙ্গে সঙ্গেই তাকে তালাক দিয়ে দেওয়ার কোন বিধান শরীয়তে নেই।

এ ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান হল-স্বামী তার স্ত্রীকে প্রথমতঃ বুঝিয়ে-সুঝিয়ে উক্ত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবে। তাতে যদি কাজ না হয় তাহলে স্বামী বিছানা পৃথক করে দিবে।

এতেও যদি স্ত্রী সংশোধিত না হয় তাহলে স্বামী তার স্ত্রীকে শাসন করার উদ্দেশ্যে যথাবিধি মৃদু প্রহার করবে। তাতেও যদি সমাধান না হয় তাহলে উভয় পক্ষের মুরব্বিদের কাছে বিষয়টি সমাধানের জন্য সোপর্দ করতে হবে।

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

পবিত্র কোরআনে এভাবেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন, আল্লাহ্ পাক বলেছেন :
وَٱلَّٰتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَٱهۡجُرُوهُنَّ فِي ٱلۡمَضَاجِعِ وَٱضۡرِبُوهُنَّۖ (سُورَةُ النِّسَاءِ : ٣٤)

“আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর।” (সূরা আন-নিসা : ৩৪)

নাফরমান স্ত্রী ও তার সংশোধনের উপায় : অতঃপর সেসব স্ত্রীলোকের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যারা স্বামীদের আনুগত্য করে না কিংবা যারা এ ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শন করে।

কোরআনে কারীম তাদের সংশোধনের জন্যে পুরুষদের যথাক্রমে তিনটি উপায় বাতলে দিয়েছে।

বলা হয়েছে : “আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর।” (সূরা আন-নিসা : ৩৪)

অর্থাৎ, স্ত্রীদের পক্ষ থেকে যদি নাফরমানী সংঘটিত হয় কিংবা এমন আশঙ্কা দেখা দেয়, তবে প্রথম পর্যায়ে তাদের সংশোধন হলো যে, নরমভাবে তাদের বোঝাবে।

যদি তাতেও বিরত না হয়, তবে দ্বিতীয় পর্যায়ে তাদের বিছানা নিজের থেকে পৃথক করে দিবে। যাতে এই পৃথক করার দরুন সে স্বামীর অসন্তুষ্টি উপলব্ধি করে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে পারে।

কোরআন কারীমে এ প্রসঙ্গে : (فِي ٱلۡمَضَاجِعِ) “তাদের শয্যা ত্যাগ কর” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

এতে ফেকাহ্শাস্ত্রবিদগণ এই মর্মোদ্ধার করেছেন যে, পৃথক করার বিষয়টি শুধু বিছানাতেই হবে, বাড়ী বা থাকার ঘর পৃথক করবে না- যাতে স্ত্রীকে সে ঘরে একা থাকতে হয়।

কারণ, তাতে তার দুঃখ-কষ্টও বেশী হবে এবং এতে কোন রকম অঘটন ঘটে যাওয়ারও সম্ভাবনা অধিক।

আলোচ্য আয়াতের শেষাংশে এরশাদ হয়েছে যে, এই তিনটি পন্থা প্রয়োগে যদি স্ত্রী অনুগত হয়ে যায়, তবে তোমরাও সহনশীলতার আশ্রয় নাও, সাধারণতঃ কথায় কথায় দোষারোপের পন্থা খুঁজে বেড়িয়ো না।

আর জেনে রেখো, আল্লাহ্ তা’আলার কুদরত ও ক্ষমতা সবার উপরেই পরিব্যাপ্ত।

মোটকথা এই আয়াতের দ্বারা মূলনীতিস্বরূপ যে বিষয়টি প্রতীয়মান হয় তা হচ্ছে এই যে, পূর্ববর্তী আয়াতসমূহের বক্তব্য অনুসারে পুরুষ ও নারীদের অধিকার পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ,

বরং পুরুষের তুলনায় নারীদের দুর্বলতার কারণে তাদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে তুলনামূলকভাবে বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ, নারীরা বল প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার আদায় করে নিতে পারে না।

কিন্তু তথাপি এই সমতার অর্থ এই নয় যে, পুরুষ ও নারীর মধ্যে মর্যাদার কোন পার্থক্যও থাকবে না,

বরং দু’টি ন্যায়সঙ্গত ও তাৎপর্যের প্রেক্ষিতেই পুরুষদেরকে নারীদের পরিচালক নিযুক্ত করা হয়েছে।

প্রথমতঃ পুরুষকে তার জ্ঞানৈশ্বর্য ও পরিপূর্ণ কর্মক্ষমতার কারণে নারী জাতির উপরে মর্যাদা দেয়া হয়েছে, যা অর্জন করা নারী জাতির পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়।

দৈবাৎ কিংবা ব্যক্তি-বিশেষের কথা স্বতন্ত্র।

দ্বিতীয়তঃ নারীর যাবতীয় প্রয়োজনের নিশ্চয়তা পুরুষরা নিজের উপার্জন কিংবা স্বীয় সম্পদের দ্বারা বিধান করে থাকে।
প্রথম কারণটি হল, আল্লাহ্ তা’আলা কর্তৃক নির্ধারিত ও মানুষের নিজস্ব ক্ষমতা বহিভর্‚ত। আর দ্বিতীয় কারণটি নিজের উপার্জিত ও ক্ষমতা-ভিত্তিক।

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

তাছাড়া একথাও বলা যেতে পারে যে, একই পিতা-মাতার সন্তানদের মধ্যে কাউকে শাসক, কাউকে শাসিত বানানোর জন্য বুদ্ধি ও ন্যায়ের আলোকে দু’টি বিষয় অপরিহার্য ছিল :

(১) যাকে শাসক বানানো হবে, তার মধ্যে জ্ঞান ও কর্মের নিরিখে শাসনকার্যের যোগ্যতা;

(২) তার অভিভাবকত্বে শাসিতের সম্মতি। প্রথম কারণটি পুরুষের শাসকোচিত যোগ্যতার পরিচায়ক।

আর দ্বিতীয় কারণ শাসিত হওয়ার ব্যাপারে নারীদের স্বীকারোক্তি। কারণ, নারীরা যখন

বিয়ের সময় নিজের খোরপোষ ও মোহরের শর্তে বিয়ের অনুমতি দান করে, তখনই সে পুরুষদের অভিভাবকত্ব মেনে নেয়।

সারকথা, এ আয়াতের প্রথম বাক্যে পারিবারিক ও সামাজিক জীবন-ব্যবস্থার একটি মূলনীতি বাতলে দেয়া হয়েছে।

আর তাহলো এই যে, অধিকাংশ বিষয়ে অধিকারের সমতা-বিধান সত্তে¡ও নারীর উপর পুরুষের একটি শাসকোচিত বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

নারীরা হল পুরুষের শাসিত ও অধীন।

এই মূলনীতির ভিত্তিতে পৃথিবীতে নারীদের দু’টি শ্রেণী রয়েছে। একটি হল তাদের শ্রেণী- যারা আলোচ্য মূলনীতি এবং স্থিরীকৃত চুক্তির অনুবর্তী রয়েছে এবং পুরুষের অভিভাবকত্ব স্বীকার করে নিয়ে তার আনুগত্য অবলম্বন করেছে।

আর দ্বিতীয় শ্রেণীটি হল- সে সমস্ত নারীরা, যারা যথার্থভাবে এ মূলনীতির অনুবর্তী থাকেনি।

প্রথম শ্রেণীর নারীরা পারিবারিক ও বৈষয়িক শান্তি ও স্বস্তির জন্য নিজেরাই যিম্মাদার। সুতরাং তাদের কোন সংশোধনের প্রয়োজন নেই।

আর দ্বিতীয় শ্রেণীর নারীদের সংশোধনকল্পে এ আয়াতের দ্বিতীয় বাক্যে এমন এক সুষ্ঠু ব্যবস্থা বাতলে দেয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে ঘরের বিষয় ঘরের ভেতরেই সংশোধিত হয়ে যেতে পরে

এবং স্বামী-স্ত্রীর বিবাদ-বিসম্বাদ তাদের দু’জনের মধ্যেই মীমাংসা হয়ে যেতে পারে- তৃতীয় কোন লোকের যেন প্রয়োজনই না হয়।

এতে পুরুষদেরকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে যে, তোমরা যদি নারীদের অবাধ্যতা কিংবা আনুগত্যের কিছু অভাব অনুভব কর, তবে সর্বাগ্রে বুঝিয়ে-শুনিয়ে তাদের মানসিক সংশোধন কর।

এতেই যদি ফলোদয় হয়ে যায়, তবে বিষয়টি এখানেই মিটে গেল। এতে সংশ্লিষ্ট স্ত্রীলোকটি সব সময়ের জন্য পাপ থেকে বেঁচে গেল। আর পুরুষও মানসিক যাতনা থেকে রেহাই পেল। এভাবে উভয়ে দুঃখ-বেদনার কবল থেকে মুক্তি পেল।

পক্ষান্তরে যদি বুঝিয়ে-শুনিয়ে কাজ না হয়, তখন

দ্বিতীয় পর্যায়ে তাদেরকে সতর্ক করার জন্য এবং নিজের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে নিজে পৃথক বিছানায় শোবে।

এটা একটা মামুলি শাস্তিÍ এবং উত্তম সতর্কীকরণ। এতে যদি স্ত্রী সতর্ক হয়ে যায়, তবে বিবাদটিও এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারে।

আর যদি সে এ ভদ্রজনোচিত শাস্তিÍর পরেও স্বীয় অবাধ্যতা ও দুষ্কর্ম থেকে ফিরে না আসে,

তাহলে তৃতীয় পর্যায়ে সাধারণভাবে মার-ধর করারও অনুমতি রয়েছে। আর তার সীমা হল এই যে, শরীরে যেন সে মার-ধরের প্রতিক্রিয়া কিংবা জখম না হয়।

কিন্তু এই পর্যায়ে শাস্তিÍদানকেও রাসূলে করীম (সা.) পছন্দ করেননি, বরং তিনি বলেছেন, ‘ভাল লোক এমন করে না’।

যাহোক, এ সাধারণ মার-ধরের মাধ্যমেই যদি সমস্যার সমাধান হয়ে যায় তবুও উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে গেল।

এতে যেমন স্ত্রীদের সংশোধনকল্পে পুরুষদেরকে তিনটি অধিকার দান করা হয়েছে, তেমনিভাবে আয়াতের শেষাংশে একথাও বলা হয়েছে :

فَإِنۡ أَطَعۡنَكُمۡ فَلَا تَبۡغُواْ عَلَيۡهِنَّ سَبِيلًاۗ (سُورَةُ النِّسَاءِ : ٣٤ (

“যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করো না।” (সূরা আন-নিসা : ৩৪)

অর্থাৎ, যদি এ তিনটি ব্যবস্থার ফলে তারা তোমাদের কথা মানতে আরম্ভ করে, তবে তোমরাও আর বাড়াবাড়ি করো না

এবং দোষানুসন্ধান করতে যেও না, বরং কিছু সহনশীলতা অবলম্বন কর।

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

আর একথা খুব ভাল করে জেনে রেখো যে, আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদেরকে নারীদের উপর তেমন কোন উচ্চ মর্যাদা দান করেননি।

আল্লাহ্ তা’আলার মহত্ত¡ তোমাদের উপরও বিদ্যমান রয়েছে, তোমরা কোন রকম বাড়াবাড়ি করলে তার শাস্তিÍ তোমাদেরকেও ভোগ করতে হবে।বিবাদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উভয় পরিবারের সালিসের মাধ্যমে মীমাংসা করার বিধান :

উল্লেখিত ব্যবস্থাটি ছিল- এ কারণে যাতে ঘরের ব্যাপার ঘরেই মীমাংসা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু অনেক সময় মনোমালিন্য বা বিবাদ দীর্ঘায়িতও হয়ে যায়।

আর তা স্ত্রীর স্বভাবের তিক্ততা ও অবাধ্যতা কিংবা পুরুষের পক্ষ থেকে অহেতুক কড়াকড়ি প্রভৃতি যে কোন কারণেই হোক- এমতাবস্থায় ঘরের বিষয় আর ঘরে সীমিত থাকে না। বাইরে নিয়ে যাওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

কিন্তু সাধারণতঃ এসব ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের সমর্থকরা একে অপরকে মন্দ বলে এবং পারস্পরিক অপবাদ আরোপ করে বেড়ায়- যার ফলে উভয় পক্ষের উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে

এবং শেষ পর্যন্ত দুজনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিবাদই পারিবারিক ঝগড়ার রূপ পরিগ্রহ করে।

আলোচ্য সূরা নিসার ৩৫ নং আয়াতে কোরআনে কারীম এ ধরণের বিবাদ-বিসম্বাদের দরজা বন্ধ করার উদ্দেশ্যে সমসাময়িক শাসকবর্গ,

উভয়পক্ষের সমর্থক ও পক্ষাবলম্বী এবং মুসলমান দলকে সম্বোধন করে এমন এক পূত-পবিত্র পন্থা বাতলে দিয়েছে, যাতে পক্ষদ্বয়ের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে যেতে পারে

এবং সেই সঙ্গে পরস্পর অপবাদারোপের পথও বন্ধ হয়ে গিয়ে আপোষ-মীমাংসার পথ বেরিয়ে আসতে পারে।

আর ঘরের বিবাদ ঘরে মীমাংসা না হতে পারলেও অন্ততঃ পরিবারের মধ্যেই যেন তা হয়ে যায়; আদালতে মামলা-মোকাদ্দমা রুজু করার ফলে যেন বিষয়টি হাটে-ঘাটে বিস্তার লাভ না করে।

আর তা হল এই যে, সরকার, উভয়পক্ষের মুরব্বী-অভিভাবক অথবা মুসলমানদের কোন শক্তিশালী সংস্থা তাদের (অর্থাৎ, স্বামী-স্ত্রীর) মধ্যে আপোষ করিয়ে দেয়ার জন্য দু’জন সালিশ নির্ধারণ করে দিবেন।

একজন পুরুষের পরিবার থেকে এবং একজন স্ত্রীর পরিবার থেকে।

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

এতদুভয় ক্ষেত্রে সালিশ অর্থে (حَكَمٌ) (হাকাম) শব্দ প্রয়োগ করে কোরআন নির্বাচিত সালিশদ্বয়ের প্রয়োজনীয় গুণ-বৈশিষ্ট্যের বিষয়টিও নির্ধারণ করে দিয়েছে।

আর তা হচ্ছে এই যে, এতদুভয়ের মধ্যেই বিবাদ মীমাংসা করার গুণ থাকতে হবে।

বলাবাহুল্য যে, এ গুণটি সে ব্যক্তির মধ্যেই থাকতে পারে, যিনি বিজ্ঞও হবেন এবং তৎসঙ্গে বিশ্বস্ত, দ্বীনদারও হবেন।

সারকথা, একজন সালিশ পুরুষের (স্বামীর) পরিবার থেকে এবং একজন মহিলার (স্ত্রীর) পরিবার থেকে নির্বাচিত করে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের কাছে পাঠানো হবে।

অতঃপর সেখানে গিয়ে এতদুভয় কি কি কাজ করবেন এবং এদের দায়িত্বই বা কি হবে কোরআনে কারীম তা স্থির করে দেয়নি।

অবশ্য বর্ণনাশেষে একটি বাক্য :

إِن يُرِيدَآ إِصۡلَٰحٗا يُوَفِّقِ ٱللَّهُ بَيۡنَهُمَآۗ (سُورَةُ النِّسَاءِ : ٣٥)

“তারা উভয়ে মীমাংসা চাইলে আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সবকিছু অবহিত।” (সূরা আন-নিসা : ৩৫)

অর্থাৎ, যদি এতদুভয় সালিশ সমস্যার সমাধান এবং পারস্পরিক সমঝোতার মনোভাব গ্রহণ করে,

তাহলে আল্লাহ্ তা’আলা তাদের কাজে সহায়তা দান করবেন এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সদ্ভাব সৃষ্টি করে দিবেন।

এখানে আলোচ্য আয়াতে ব্যবহৃত বাক্যটির দ্বারা দু’টি বিষয় বোঝা যায় :(এক) আপোষ-মীমাংসাকারী সালিশদ্বয়ের নিয়ত যদি সৎ হয়

এবং সত্যিকারভাবেই যদি তারা স্বামী-স্ত্রীর সমঝোতা কামনা করেন, তাহলে আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ থেকে তাদের গায়েবী সাহায্য করা হবে, ফলে তারা নিজেদের উদ্দেশ্যে কৃতকার্য হবেন।

আর তাতে করে তাদের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মনেও আল্লাহ্ তা’আলা সম্প্রীতি ও মহব্বত সৃর্ষ্টি করে দিবেন। এতে আরো একটি বিষয় প্রতীয়মান হয় যে, এতদসত্তে¡ও যদি পরস্পরিক মীমাংসা না হয়,

তবে বুঝতে হবে, সালিশদ্বয়ের যে কোন একজনের মনে হয়তো নিঃস্বার্থতার অভাব ছিল।

(দুই) এ বাক্যের দ্বারা একথাও বোঝা যায় যে, দু’পক্ষের সালিশকে পাঠানোর উদ্দেশ্য হল স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ মীমাংসা করা, এছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই।

অবশ্য একথা স্বতন্ত্র যে, উভয়পক্ষ সম্মত হয়ে এতদুভয় ব্যক্তিকে নিজেদের উকীল, প্রতিনিধি অথবা সালিশ নির্ধারণ করবে এবং একথা স্বীকার করে নিবে যে, তোমরা মিলে-মিশে যে সিদ্ধান্ত নিবে, আমরা তাই মেনে নিব।

এক্ষেত্রে এই সালিশদ্বয় সম্পূর্ণভাবে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারী হয়ে যাবে। তারা দু’জনে তালাকের ব্যাপারে একমত হয়ে গেলে তালাকই হয়ে যাবে।

আবার তারা ‘খোলা’ প্রভৃতি যে কোন সিদ্ধান্তে একমত হবে, তাই হবে এবং পুরুষের পক্ষ থেকে প্রদত্ত অধিকার অনুসারে যদি তারা স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেয়, তবে তাই মেনে নিতে হবে।

পূর্ববর্তী মনীষীবৃন্দের মধ্যে হযরত হাসান বসরী (রাহ্.) ও হযরত ইমাম আবু হানীফা (রাহ্.) প্রমূখেরও এমনি মত। (তাফসীরে রুহুল মা’আনী)

হযরত আলী (রা.)-এর সামনে একবার এমনি এক ঘটনা উপস্থিত হয়। তাতেও প্রমাণ হয় যে, একমাত্র আপোষ-মীমাংসা ছাড়া উল্লেখিত সালিশদ্বয়ের অন্য কোন অধিকার থাকে না,

যতক্ষণ না উভয়পক্ষ তাদেরকে পূর্ণ অধিকার দান করে। ঘটনাটি সুনানে বায়হাকী গ্রন্থে হযরত ওবায়দা সালমানীর রেওয়ায়েতক্রমে নিম্নরূপ বর্ণিত রয়েছে

“একজন পুরুষ ও একজন মহিলা হযরত আলী (রা.)-এর খেদমতে হাযির হল। তাদের উভয়ের সাথেই ছিল বহু লোকের এক এক দল।

হযরত আলী (রা.) নির্দেশ দিলেন যে, পুরুষের পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন ‘হাকাম’ বা সালিশ নির্ধারণ করা হোক।

অতঃপর সালিশ নির্ধারিত হয়ে গেলে তাদের সম্বোধন করে হযরত আলী (রা.) বললেন, তোমরা কি তোমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জান?

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

আর তোমাদেরকে কি করতে হবে সে ব্যাপারে কি তোমরা অবগত? শোন! তোমরা যদি এই স্বামী-স্ত্রীকে একত্রে রাখার ব্যাপারে এবং তাদের পারস্পরিক আপোষ-মীমাংসা করে দেয়ার ব্যাপারে একমত হতে পার, তবে তাই করো।

পক্ষান্তরে তোমরা যদি মনে কর যে, তাদের মধ্যে আপোষ-মীমাংসা করা সম্ভব নয়, কিংবা তা করে দিলে টিকতে পারবে না

এবং তোমরা উভয়ে তাদের পৃথক করে দেয়ার ব্যাপারে একমত হয়ে এতেই মঙ্গল বিবেচনা কর, তবে তাই করবে।

একথা শুনে মহিলাটি বলল, আমি এটা স্বীকার করি- এতদুভয় সালিশ আল্লাহর আইন অনুসারে যে ফায়সালা করবে,

তা আমার মতের পক্ষে হোক অথবা বিরোধী হোক, আমি তাই মেনে নিব।

কিন্তু পুরুষটি বলল, পৃথক হয়ে যাওয়া কিংবা তালাক হয়ে যাওয়া তো আমি কোনক্রমেই সহ্য করবো না।

অবশ্য সালিশদের এ অধিকার দিচ্ছি যে, তারা আমার উপর যে কোন রকম আর্থিক জরিমানা আরোপ করে তাকে (স্ত্রীকে) সম্মত করিয়ে দিতে পারেন।

একথা শোনার পর হযরত আলী (রা.) বললেন, না তা হয় না।

তোমারও সালিশদের তেমনি অধিকার দেয়া উচিত যেমন তোমার স্ত্রী দিয়েছে।”

এ ঘটনার দ্বারা কোন কোন মুজতাহিদ ইমাম উদ্ভাবন করেছেন যে, সালিসের অধিকার-সম্পন্ন হওয়া কর্তব্য।

যেমন, হযরত আলী (রা.) উভয়পক্ষকে বলে তাদেরকে অধিকার-সম্পন্ন করেছিলেন।

কিন্তু ইমাম আযম হযরত আবু হানিফা (রাহ্.) ও হযরত হাসান বসরী (রাহ্.) সাব্যস্ত করেছেন যে, উল্লেখিত সালিশদ্বয়ের অধিকার-সম্পন্ন হওয়াই যদি অপরিহার্য হতো,

তবে হযরত আলী (রা.) কর্তৃক উভয়পক্ষের সম্মতি লাভের চেষ্টা করার কোন প্রয়োজনীয়তাই ছিল না।

সুতরাং উভয়পক্ষকে সম্মত করার চেষ্টাই প্রমাণ করে যে, প্রকৃত প্রস্তাবে এই সালিশদ্বয় অধিকার-সম্পন্ন নয়।

অবশ্য স্বামী-স্ত্রী যদি অধিকার দান করে, তবে অধিকার-সম্পন্ন হয়ে যায়।

কোরআনে কারীমের এ শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের পারস্পরিক বিবাদ-বিসম্বাদের মীমাংসার ক্ষেত্রে অতি চমৎকার এক নতুন পথের উন্মোচন হয়ে যায়।

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

এসব পর্যায় অতিক্রম করার পরও যদি কোনমতেই বিষয়টি সমাধান না হয় আর এভাবে

এক্ষেত্রে সংসার করা দুর্বিসহ হয়ে পড়ে তবে এহেন পরিস্থিতিতে অশান্তির আগুনে জ্বলে

পুড়ে আত্মহত্যা, অন্যকে হত্যা ইত্যাদির মত অঘটনের অভিশাপ থেকে বাঁচার জন্য ‘তালাক’ নামক যে সর্বশেষ ব্যবস্থা তা নিঃসন্দেহে আশীর্বাদ।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, অনিয়মে গাড়ি চালানো অথবা অনিয়মে ব্রেক কষার দরুন এই পৃথিবীতে অহরহ কত যে অঘটন ঘটছে তার ইয়ত্তা নেই।

কিন্তু এজন্য আজ পর্যন্ত গাড়ি চালানো বন্ধ করে দেওয়ার কিংবা গাড়ির ব্রেক সিষ্টেম উঠিয়ে দেওয়ার পক্ষে কাউকে দাবী উত্থাপন করতে শোনা যায়নি।

বরং ওই সব দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে নিয়ম মোতাবেক গাড়ি চালানোর ব্যাপারে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে- যা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত।

ঠিক তেমনিভাবে অহেতুক বা অনিয়মে কেউ কেউ কখনও তালাক দিয়ে দিলে তজ্জন্য তালাক প্রথায় হস্তক্ষেপ না করে

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

বরং অহেতুক বা অনিয়মে তালাক প্রদানকারীর বিরুদ্ধে যথাযোগ্য প্রয়োজনীয় আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হবে যুক্তিযুক্ত।

আর ইসলামী শাসন ব্যবস্থায় এর যথাযথ ব্যবস্থাও রয়েছে, যা কার্যকরী করা হলে তালাক নিয়ে আর কোন সমস্যা থাকতে পারে না।

কোন কোন পরিস্থিতিতে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া যায় : স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, অতি সাধারণ ব্যাপারে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কোন অনুমতি ইসলামী শরীয়তে নেই।

শরীয়ত এক্ষেত্রে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়ে এ ব্যাপারে বিশেষ ও বিশদ নীতিমালা প্রণয়ন করে দিয়েছে।

অতএব পান থেকে চুন খসলেই তালাক দেওয়ার যে প্রবণতা কখনও কখনও কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায়- ইসলামী শরীয়তে তা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।

বিশেষ কারণে একান্ত প্রয়োজনে যথাবিধি তালাক দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে মাত্র।

আর যে সকল কারণে একজন স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে- শরীয়ত তা সুনির্দিষ্টরূপে চিহ্নিত করে দিয়েছে।

তাও আবার প্রাগুক্ত পর্যায়গুলো অতিক্রম করার পর। অর্থাৎ, প্রথমে বুঝানো, অতঃপর বিছানা পৃথকীকরণ,

তারপর মৃদু শাসন, এরপর উভয় পক্ষের অভিভাবকদের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করার পরও যদি কোন সুরাহা না হয় তখন নিম্নবর্ণিত কারণে একজন স্বামী তার স্ত্রীকে যথাবিধি তালাক দিতে পারে।

আর তালাক প্রদানের যৌক্তিক কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লামা শামী (রাহ্.) বলেছেন : “মূলতঃ তালাক নিষিদ্ধ।” যার মর্ম হলো একান্ত প্রয়োজন ছাড়া তালাক দেওয়া নিষিদ্ধ।

এজন্য বলা হয়েছে যে, স্বভাব চরিত্রের মধ্যে পরস্পর ব্যতিক্রম হওয়া এবং পরস্পর এমন শত্রুতা সৃষ্টি হয়ে যাওয়া, যা আল্লাহ্ তা’আলার নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন করতে বাধ্য করে-

এমন সব অসুবিধা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তালাক দেওয়া বৈধ হয়ে থাকে। (শামী যাকারিয়া : ৪র্থ খন্ড, ৪২৮ পৃ.)

তিনি আরও বলেছেন : “দুররুল মুখতার কিতাবে “যদি স্বামী-স্ত্রী মিলে-মিশে একত্রে থাকা সম্ভব না হয়” বলে যে কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আল্লামা শামী (রাহ্.)

বলেছেন : যদি স্বামী নির্দিষ্ট অঙ্গ-হারা হয়ে যায় অথবা পুরুষত্বহীন হয়ে যায় অথবা সহবাসের পূর্ণতায় পৌঁছতে যদি অক্ষম হয় অথবা যাদুগ্রস্ত হওয়াতে যদি যৌন ক্ষমতা

হারিয়ে ফেলে তাহলে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে। (শামী যাকারিয়া : ৪র্থ খন্ড, ৪২৯ পৃ.)

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

কী কী কারণে একজন স্ত্রী তার স্বামীর কাছে তালাক চাইতে পারে : একজন স্ত্রীলোক শরীয়ত-সম্মত কারণ ছাড়া তার স্বামীর কাছে তালাক চাওয়া যে কত বড় অপরাধ সেটা ইতিপূর্বে ভূমিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই একজন মুসলিম স্ত্রীকে তার খেয়াল-খুশি অনুযায়ী তালাক চাইতে ইসলাম নিষেধ করেছে। তবে দ্বীনে ইসলাম একজন স্ত্রীকে বিশেষ পরিস্থিতিতে একান্ত প্রয়োজনে স্বামীর কাছে তালাক চাওয়ারও অধিকার দিয়েছে।

এমনকি স্বামী যদি তালাক না দেন তাহলে দেশের বৈধ প্রশাসন তথা বিচার ব্যবস্থার দারস্থ হয়ে স্ত্রীকে বিবাহ বিচ্ছেদ করিয়ে নেওয়ার অধিকার দিয়েছে ইসলাম।

এখানে আলোচ্য বিষয় হলো কী কী কারণে একজন স্ত্রী তার স্বামীর কাছে তালাক চাইতে পারে। এ ক্ষেত্রে অনেকগুলো কারণ রয়েছে।

নিম্নে তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো :

১. স্বামী যদি স্ত্রীর ভরণ-পোষণ দিতে অক্ষম হয়।

২. ক্ষমতা থাকা সত্তে¡ও যদি স্বামী তার স্ত্রীকে ভরণ-পোষণ না দেয়।

৩. স্বামী যদি স্ত্রীর বিশেষ হক আদায় না করে।

৪. স্বামীর নির্দিষ্ট অঙ্গ যদি না থাকে।

৫. স্বামী যদি স্ত্রীর বিশেষ হক আদায় করতে অক্ষম হয়।

৬. স্বামী যদি কুড় বা কুষ্ঠ রোগী হয়।

৭. স্বামী যদি স্ত্রীকে অমানবিক নির্যাতন করে।

৮. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যদি চরম সীমার মনোমালিন্যতা দেখা দেয়।

এভাবে আরও অনেক কারণ রয়েছে- যার পরিপ্রেক্ষিতে একজন স্ত্রী তার স্বামীর নিকট তালাক চাইতে পারে।

আর এ অবস্থায় স্বামী যদি তালাক না দেয় কিংবা তালাক দিতে গড়িমসি করে তবে সে ক্ষেত্রে স্ত্রী কাযী তথা বিচারকের দারস্থ হয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ করে নিতে পারে।

ফেক্বাহ শাস্ত্রের প্রায় প্রত্যেকটি কিতাবেই এর প্রমাণ রয়েছে।

রাগ বা ক্রোধান্বিত অবস্থায় তালাক দিলে তা কার্যকর হবে কি? : রাগের অবস্থায় তালাক দিলে তা কার্যকর হবে কি না- এ নিয়ে আলোচনা করার পূর্বে রাগের বিভিন্ন অবস্থা বা স্তর নিয়ে প্রথমে আলোচনা করা প্রয়োজন।

রাগ বা ক্রোধের সাধারণতঃ দু’টি অবস্থা হয়ে থাকে। প্রথমতঃ যদি রাগ এমন স্তরে পৌঁছে যায় যে, রাগান্বিত ব্যক্তির বিবেক-বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়।

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

এ অবস্থায় তার মুখ দিয়ে কী বের হচ্ছে তা সে বুঝতে পারে না।

এমতাবস্থায় তালাক দেওয়ার ইচ্ছা না থাকা সত্তে¡ও যদি রাগান্বিত ব্যক্তির মুখ থেকে তালাকের শব্দ বেরিয়ে আসে তাহলে তার উক্ত তালাক কার্যকর হবে না।

দ্বিতীয়তঃ যদি রাগ তার প্রাথমিক অবস্থায় থাকে; এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিবেক-বুদ্ধি বহাল থাকে। এ সময় তার মুখ দিয়ে যা উচ্চারিত হয় তা সে বুঝতে পারে।

এমতাবস্থায় সে তালাক দিয়ে দিলে তা কার্যকর হয়ে যাবে।

পবিত্র কোরআনের সূরা আত্ তালাকে তালাকের কতিপয় বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। তারমধ্যে প্রথম বিধান হচ্ছে :

فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ (سُورَةُ الطَّلَاقِ : ١)

অর্থাৎ “স্ত্রীদের তালাক দিবে ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে।” (সূরা আত্-তালাক্ব : ১)(عِدَّتٌ)-এর শাব্দিক অর্থ গণনা করা।

শরীয়তের পরিভাষায় সেই সময়কালকে ইদ্দত বলা হয়, যাতে স্ত্রী এক স্বামীর বিবাহ থেকে বের হওয়ার পর দ্বিতীয় বিবাহের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞাধীন থাকে। কোন স্বামীর বিবাহ থেকে বের হওয়ার উপায় দু’টি।

(এক) স্বামীর ইন্তেকাল হয়ে গেলে। এই ইদ্দতকে ‘ইদ্দতে ওফাত’ বলা হয়। গর্ভবতী নয়- এমন মহিলাদের জন্যে এই ইদ্দত চার মাস দশ দিন।

(দুই) বিবাহ থেকে বের হওয়ার দ্বিতীয় উপায় তালাক। গর্ভবতী নয়- এমন মহিলাদের জন্যে তালাকের ইদ্দত ইমাম আবু হানীফা (রাহ্.) ও অন্য কয়েকজন ইমামের মতে পূর্ণ তিন হায়েয।

ইমাম শাফেয়ী (রাহ্.) ও অন্য কয়েকজন ইমামের মতে তালাকের ইদ্দত তিন তোহর(পবিত্রতাকাল)।

সারকথা এর জন্যে কোন দিন ও মাস নির্ধারিত নেই; বরং যত মাসে তিন হায়েয অথবা তিন তোহর পূর্ণ হয়, তাই তালাকের ইদ্দত। সহীহ্ মুসলিমের এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) :

فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ (سُورَةُ الطَّلَاقِ : ١)

“স্ত্রীদের তালাক দিবে ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে।” (সূরা আত্-তালাক্ব : ১) এ আয়াতকে (فَطَلِّقُوْهُنَّ لِقَبْلِ عِدَّتِهِنَّ) পাঠ করেছেন।

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

হযরত ইবনে ওমর (রা.) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-

এর এক রেওয়ায়াতে (لِقَبْلِ عِدَّتِهِنَّ) ও অন্য এক রেওয়ায়াতে (فِيْ قَبْلِ عِدَّتِهِنَّ) বর্ণিত আছে। সহীহ্

বোখারী ও মুসলিমের এক হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন :

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا : أَنَّهُ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ وَهِيَ حَائِضٌ، عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَسَأَلَ

عُمَرُ بْنُ الخَطَّابِ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ ذَلِكَ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ্রمُرْهُ فَلْيُرَاجِعْهَا، ثُمَّ

لِيُمْسِكْهَا حَتَّى تَطْهُرَ، ثُمَّ تَحِيضَ ثُمَّ تَطْهُرَ، ثُمَّ إِنْ شَاءَ أَمْسَكَ بَعْدُ، وَإِنْ شَاءَ طَلَّقَ قَبْلَ أَنْ يَمَسَّ، فَتِلْكَ العِدَّةُ الَّتِي أَمَرَ اللَّهُ

أَنْ تُطَلَّقَ لَهَا النِّسَاءُ (رَوَاهُ البُخَارِيُّ فِيْ كِتَابِ الطَّلاَقِ :

٥٢٥١)

“তিনি তাঁর স্ত্রীকে হায়েয অবস্থায় তালাক দিয়েছিলেন। হযরত ওমর (রা.) একথা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর গোচরীভ‚ত করলে তিনি খুব নারাজ হয়ে বললেন : তার উচিত হায়েয অবস্থায় তালাক প্রত্যাহার করে নেয়া এবং স্ত্রীকে বিবাহে রেখে দেয়া।

অতঃপর এই হায়েয থেকে পবিত্র হওয়ার পর আবার যখন স্ত্রীর হায়েয হবে এবং তা থেকে পবিত্র হবে, তখন যদি তালাক দিতেই চায়, তবে সহবাসের পূর্বে পবিত্র অবস্থায় তালাক দিবে।

আর এই ইদ্দতের আদেশই আল্লাহ্ তা’আলা (আলোচ্য) আয়াতে দিয়েছেন।” (সহীহ্ বোখারী, কিতাবুত-ত্বালাক : ৫২৫১)এই হাদীস দ্বারা কয়েকটি বিষয় প্রমাণিত হয়-

(এক) হায়েয অবস্থায় তালাক দেয়া হারাম। (দুই) কেউ এমতাবস্থায় তালাক দিলে সেই তালাক প্রত্যাহার করে নেয়া ওয়াজিব (যদি প্রত্যাহারযোগ্য তালাক হয়।

হযরত ইবনে ওমর (রা.)-এর ঘটনায় তদ্রƒপই ছিল)। (তিন) যে তোহরে তালাক দিবে, সেই তোহরে স্ত্রীর সাথে সহবাস না করা।

উপরোক্ত হাদীসদৃষ্টে আলোচ্য আয়াতের এই অর্থ নির্দিষ্ট হয়ে গেছে যে, কোন স্ত্রীকে তালাক দিতে হলে ইদ্দত শুরু হওয়ার পূর্বে তালাক দিতে হবে।

ইমাম আযম আবু হানীফা (রাহ্.)-এর মতে হায়েয থেকে, ইদ্দত শুরু হয়।

তাই আয়াতের অর্থ হবে এই যে, যে তোহরে তালাক দেয়ার ইচ্ছা থাকে সেই তোহরে সহবাস করবে না

এবং তোহরের শেষ ভাগে হায়েয আসার পূর্বে তালাক দিবে।

ইমাম শাফেয়ী (রাহ্.) প্রমুখের মতে ইদ্দত তোহর থেকে শুরু হয়। তাই আয়াতের অর্থ হবে এই যে, তোহরের শুরুতেই তালাক দিবে।

তালাকের দ্বিতীয় বিধান হচ্ছে :

وَأَحۡصُواْ ٱلۡعِدَّةَۖ (سُورَةُ الطَّلَاقِ : ١)

“এবং ইদ্দত গণনা করো।” (সূরা আত্-তালাক্ব : ১)

(إِحْصَاءٌ) শব্দের অর্থ গণনা করা। সুতরাং আয়াতের অর্থ এই যে, ইদ্দতের দিনগুলো সযত্নে স্মরণ রেখো এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই শেষ মনে করে নেয়ার মত ভুল করো না।

আর ইদ্দতের দিনগুলো স্মরণে রাখার এই দায়িত্ব পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ের। কিন্তু আয়াতে পুরুষ-বাচক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

কেননা, সাধারণভাবে সেসব বিধান পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ের মধ্যে অভিন্ন, সেগুলোর ক্ষেত্রে সাধারণতঃ পুরুষ-বাচক পদই ব্যবহার করা হয়;

স্ত্রীরা প্রসঙ্গতঃ তাতে অন্তর্ভূক্ত থাকে। এই বিশেষ ক্ষেত্রে তাফসীরের সার সংক্ষেপে বর্ণিত বিশেষ রহস্যও থাকতে পারে যে,

স্ত্রীরা অধিক আনমনা, তাই সরাসরি পুরুষদেরকেই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

তালাকের তৃতীয় বিধান হচ্ছে :

لَا تُخۡرِجُوهُنَّ مِنۢ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخۡرُجۡنَ (سُورَةُ الطَّلَاقِ : ١)

“তাদেরকে তাদের গৃহ থেকে বহিষ্কার করো না এবং তারাও যেন বের না হয়।” (সূরা আত্-তালাক্ব : ১)অর্থাৎ, স্ত্রীদের তাদের গৃহ থেকে বহিষ্কার করো না।

এখানে তাদের গৃহ বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, যে পর্যন্ত তাদের বসবাসের হক পুরুষের দায়িত্বে থাকে, সেই পর্যন্ত গৃহে তাদের অধিকার আছে।

তাতে তাদের বসবাস বহাল রাখা কোন কৃপা নয়; বরং প্রাপ্য আদায়। বসবাসের হকও স্ত্রীর অন্যতম হক। আলোচ্য আয়াত ব্যক্ত করেছে যে, এই হক কেবল তালাক দিলেই নিঃশেষ হয়ে যায় না।

বরং ইদ্দতের দিনগুলোতে এই গৃহে বসবাস করার অধিকার স্ত্রীর আছে। ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পূর্বে স্ত্রীকে গৃহ থেকে বহিষ্কার করা যুলুম ও হারাম।

এমনিভাবে স্ত্রীর স্বেচ্ছায় বের হয়ে যাওয়াও হারাম; যদিও স্বামী এর অনুমতি দেয়। কেননা,

এই গৃহেই ইদ্দত অতিবাহিত করা শুধুমাত্র স্বামীরই হক নয়- আল্লাহ্ তা’আলারও হক, যা ইদ্দত পালনকারিণীর উপর ওয়াজিব।

হানাফী মাযহাবের বিধান তাই।

তালাকের চতুর্থ বিধান হচ্ছে :

إِلَّآ أَن يَأۡتِينَ بِفَٰحِشَةٖ مُّبَيِّنَةٖۚ (سُورَةُ الطَّلَاقِ : ١)

“যদি না তারা কোন সুস্পষ্ট নির্লজ্জ কাজে লিপ্ত হয়।” (সূরা আত্-তালাক্ব : ১)অর্থাৎ, ইদ্দত পালনকারিণী স্ত্রী কোন প্রকাশ্য নির্লজ্জ কাজে জড়িত হয়ে পড়লে তাকে গৃহ থেকে বহিষ্কার করা হারাম নয়।

এটা তৃতীয় বিধানের ব্যতিক্রম। প্রকাশ্য নির্লজ্জ কাজ বলে কি বোঝানো হয়েছে, এ সম্পর্কে তিন প্রকার উক্তি বর্ণিত আছে :

(এক) নির্লজ্জ কাজ বলে খোদ গৃহ থেকে বের হয়ে যাওয়াই বোঝানো হয়েছে।

এমতাবস্থায় এটা দৃশ্যতঃ ব্যতিক্রম, যার উদ্দেশ্য গৃহ থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া নয়;

বরং নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করা। উদাহরণতঃ এরূপ বলা যে, এই কাজ করা কারও উচিত নয় সেই ব্যক্তি ব্যতীত, যে মনুষ্যত্বই বিসর্জন দেয় অথবা তুমি তোমার জননীকে গালি দিও না এটা ব্যতীত যে, তুমি জননীর সম্পূর্ণই অবাধ্য হয়ে যাও।

বলাবাহুল্য যে, প্রথম দৃষ্টান্তে ব্যতিক্রম দ্বারা সেই কাজের বৈধতা ব্যক্ত করা উদ্দেশ্য নয় এবং

দ্বিতীয় দৃষ্টান্তে জননীর অবাধ্যতার বৈধতা প্রমাণ করা লক্ষ্য নয়; বরং বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে তার আরও বেশী অবৈধতা ও মন্দ হওয়া বর্ণনা করা উদ্দেশ্য।

অতএব আয়াতের বিষয়বস্তুর সার সংক্ষেপ এই হল যে, তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীরা তাদের স্বামীর গৃহ থেকে বের হবে না,

কিন্তু যদি তারা অশ্লীলতায়ই মেতে উঠে ও বের হয়ে পড়ে। সুতরাং এর অর্থ বের হয়ে যাওয়ার বৈধতা নয়;

বরং আরও বেশী নিন্দা ও নিষিদ্ধতা প্রমাণ করা। আর নির্লজ্জ কাজের এই তাফসীর

সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে,

عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، {إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ} [سُورَةُ الطَّلَاقِ : ١] قَالَ : ্রخُرُوجُهَا مِنْ بَيْتِهَا فَاحِشَةٌ مُبَيِّنَةٌগ্ধ هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحٌ عَلَى شَرْطِ مُسْلِمٍ. (مُسْتَدْرَك الحَاكِم : ٣٨١٨)

“আলোচ্য আয়াতে “যদি না তারা কোন সুস্পষ্ট নির্লজ্জ কাজে লিপ্ত হয়।” (সূরা আত্-তালাক্ব : ১)

বলে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীদের ইদ্দত পালন কালীন শরয়ী কারণ ব্যতিত তাদের স্বামীর গৃহ থেকে বের হয়ে যাওয়া অশ্লীলতারই নামান্তর।”(মুস্তাদরাক-হাকেম : ৩৮১৮)

ইমাম সুদ্দী (রাহ্.), ইবনে মায়েব (রাহ্.), নাখয়ী (রাহ্.) প্রমুখ থেকে বর্ণিত আছে।

ইমাম আযম আবু হানীফা (রাহ্.) এই তাফসীরই গ্রহণ করেছেন। (রূহুল মাআনী)

(দুই) নির্লজ্জ কাজ বলে ব্যভিচার বোঝানো হয়েছে। এমতাবস্থায় ব্যতিক্রম যথার্থ অর্থেই বুঝতে হবে।

অর্থাৎ, তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী ব্যভিচার করলে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে তার প্রতি শরীয়তের শাস্তি প্রয়োগ করার জন্যে অবশ্যই তাকে ইদ্দতের গৃহ থেকে বের করে আনা হবে।

এই তাফসীর হযরত কাতাদা (রাহ্.), হযরত হাসান বসরী (রাহ্.), হযরত শাবী (রাহ্.), হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রাহ্.),

হযরত যাহ্হাক (রাহ্.), হযরত ইকরিমা (রাহ্.) প্রমুখ থেকে বর্ণিত আছে। ইমাম আবু ইউসুফ (রাহ্.) এই তাফসীরই গ্রহণ করেছেন।

(তিন) নির্লজ্জ কাজ বলে কটু কথা-বার্তা, ঝগড়া-বিবাদ বোঝানো হয়েছে।

সেক্ষেত্রে আয়াতের অর্থ হবে এই যে, তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীদের তাদের গৃহ থেকে বহিষ্কার করা জায়েয নয়। কিন্তু যদি তারা কটুভাষিণী ও ঝগড়াটে হয় এবং স্বামীর আপনজনদের সাথে দুর্ব্যবহার করে, তবে তাদের ইদ্দতের গৃহ থেকে বহিষ্কার করা যাবে।

এই তাফসীর হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে একাধিক রেওয়ায়াতে বর্ণিত আছে। আলোচ্য আয়াতে হযরত উবাই ইবনে কাব (রা.) ও হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কিরাত এরূপ : (إِلاَّ أَنْ يَفْحَشْنَ) এই শব্দের বাহ্যিক অর্থ অশ্লীল কথাবার্তা বলা।

এই কিরাত থেকেও সর্বশেষ তাফসীরের পক্ষে সমর্থন পাওয়া যায়। (রূহুল মা’আনী) এই অবস্থায়ও ব্যতিক্রম আক্ষরিক অর্থে থাকবে।

وَتِلۡكَ حُدُودُ ٱللَّهِۚ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ ٱللَّهِ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَهُۥۚ لَا تَدۡرِي لَعَلَّ ٱللَّهَ يُحۡدِثُ بَعۡدَ ذَٰلِكَ أَمۡرٗا

(سُورَةُ الطَّلَاقِ : ١)

“এগুলো আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা। অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা লংঘন করে, সে নিজেরই অনিষ্ট করে।

সে জানে না, হয়তো আল্লাহ এই তালাকের পর কোন নতুন উপায় করে দেবেন।”

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

(সূরা আত্-তালাক্ব : ১)

حُدُودَ ٱللَّهِ (سُورَةُ الطَّلَاقِ : ١)

“আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা।” (সূরা আত্-তালাক্ব : ১)এই বলে শরীয়তের নির্ধারিত আইন-কানুন বোঝানো হয়েছে।

সুতরাং যে ব্যক্তি এগুলো লংঘন করে অর্থাৎ, আইন-কানুনের বিরোধিতা করে, সে নিজের উপর যুলুম করে; অর্থাৎ আল্লাহ্ অথবা শরীয়তের কোন ক্ষতি করে না, বরং নিজেরই ক্ষতিসাধন করে।

আর এই ক্ষতি ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয়ই হতে পারে। পারলৌকিক ক্ষতি তো শরীয়ত বিরোধী কাজের গোনাহ্ ও পরকালের শাস্তি এবং ইহলৌকিক ক্ষতি এই যে,

যে ব্যক্তি শরীয়তের নির্দেশাবলীর তোয়াক্কা না করে স্ত্রীকে তালাক দেয়, সে অধিকাংশ সময় তিন তালাক পর্যন্ত পৌঁছে ক্ষ্যান্ত হয়, যার পর পারস্পরিক প্রত্যাহার অথবা পূনর্বিবাহও হতে পারে না।

মানুষ প্রায়ই তালাক দিয়ে অনুতাপ করে এবং বিপদের সম্মুখীন হয়; বিশেষ করে সন্তান-সন্ততি থাকলে।

অতএব তালাকের বিপদ দুনিয়াতেই তার ঘাড়ে চেপে বসে। আবার অনেকেই স্ত্রীকে কষ্ট দেয়ার নিয়তে অন্যায়ভাবে তালাক দেয়। এরূপ তালাকের কষ্ট স্ত্রীও ভোগ করে।

কিন্তু পুরুষের জন্যে এটা যুলুমের উপর যুলুম এবং দ্বিগুণ শাস্তির কারণ হয়ে যায়।

(এক) আল্লাহর নির্ধারিত আইন-কানুন লংঘন করার শাস্তি এবং

(দুই) স্ত্রীর উপর যুলুম করার শাস্তি।

لَا تَدۡرِي لَعَلَّ ٱللَّهَ يُحۡدِثُ بَعۡدَ ذَٰلِكَ أَمۡرٗا (سُورَةُ الطَّلَاقِ : ١)

“সে জানে না, হয়তো আল্লাহ্্ এই তালাকের পর কোন নতুন উপায় করে দেবেন।” (সূরা আত্-তালাক্ব : ১)

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

অর্থাৎ, তুমি জান না সম্ভবতঃ আল্লাহ্ তা’আলা এই রাগ-গোস্বার পর অন্য কোন অবস্থা সৃষ্টি করে দিবেন।

অর্থাৎ, স্ত্রীর কাছ থেকে প্রাপ্ত আরাম, সন্তানের লালন-পালনের এবং গৃহের সহজ ব্যবস্থাপনার কথা চিন্তা করে তুমি তাকে পূনরায় বিবাহে রাখার ইচ্ছা করতে পার।

এমতাবস্থায় আবার বিবাহে থাকা তখন সম্ভবপর হবে, যখন তুমি তালাক দেয়ার সময় শরীয়তের আইন-কানুনের প্রতি লক্ষ্য রাখ এবং অহেতুক বাইন তালাক না দিয়ে প্রত্যাহারযোগ্য তালাক দাও।

আর এরূপ তালাক দেয়ার পর প্রত্যাহার করে নিলে পূর্ববিবাহ যথারীতি বহাল থাকে। অতএব তুমি তিন পর্যন্ত পৌঁছিয়ে তালাক দিও না,

যা প্রত্যাহারের অধিকার থাকে না এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতি সত্তে¡ও পরস্পরে পূনর্বিবাহও হালাল হয় না।

فَإِذَا بَلَغۡنَ أَجَلَهُنَّ فَأَمۡسِكُوهُنَّ بِمَعۡرُوفٍ أَوۡ فَارِقُوهُنَّ بِمَعۡرُوفٖ (سُورَةُ الطَّلَاقِ : ٢)

“অতঃপর তারা যখন তাদের ইদ্দতকালে পৌঁছে, তখন তাদের যথোপযুক্ত পন্থায়

রেখে দেবে অথবা যথোপযুক্ত পন্থায় ছেড়ে দেবে।” (সূরা আত্-তালাক্ব : ২)এখানে (أَجَلٌ) শব্দের অর্থ ইদ্দত এবং (أَجَلٌ) ‘আজাল’ পর্যন্ত পৌঁছার অর্থ ইদ্দত শেষ হওয়ার কাছাকাছি হওয়া।

তালাক সম্পর্কিত পঞ্চম বিধান : এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, যখন ইদ্দত শেষ হওযার কাছাকাছি হয়,

তখন স্থির মস্তিষ্কে পূনরায় চিন্তা করে দেখ যে, বিবাহ বহাল রাখা উত্তম- না সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ করে দেয়া ভাল। এ চিন্তার জন্যে এ সময়টি উত্তম। কারণ, ততদিনে পুরুষের সাময়িক রাগ-গোস্বা দমিত হয়ে যায়।

সুতরাং যদি স্ত্রীকে বিবাহে রাখা স্থির হয়, তবে রেখে দাও। পরবর্তী আয়াতের ইঙ্গিত এবং হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী এর সুন্নত-সম্মত পন্থা এই যে, মুখে বলে দাও আমি তালাক প্রত্যাহার করলাম।

অতঃপর এর জন্যে দু’জন সাক্ষী রাখ।পক্ষান্তরে যদি বিবাহ ভেঙ্গে দেয়াই সিদ্ধান্ত হয়, তবে স্ত্রীকে সুন্দর পন্থায় মুক্ত করে দাও।

অর্থাৎ, ইদ্দত শেষ হতে দাও। ইদ্দত শেষ হয়ে গেলেই স্ত্রী মুক্ত ও স্বাধীন হয়ে যায়।

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

ষষ্ঠ বিধান : ইদ্দত সমাপ্ত হলে স্ত্রীকে রাখার সিদ্ধান্ত হোক অথবা মুক্ত করে দেয়ার, উভয় অবস্থাতে কোরআন পাক তা ‘মারূফ’

অর্থাৎ, যথোপযুক্ত পন্থায় সম্পন্ন করতে বলেছে। আর ‘মারূফ’ শব্দের অর্থ পরিচিত পন্থা। উদ্দেশ্য এই যে, যে পন্থা শরীয়ত ও সুন্নত দ্বারা প্রমাণিত এবং মুসলমানদের মধ্যে সাধারণভাবে খ্যাত, সেই পন্থা অবলম্বন কর।

আর তা এই যে, বিবাহে রাখা এবং তালাক প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত হলে স্ত্রীকে মুখে অথবা কাজে-কর্মে কষ্ট দিও না,

তার উপর অনুগ্রহ রেখো না এবং তার যে কর্মগত ও চরিত্রগত দুর্বলতা তালাকের কারণ হচ্ছিল।

অতঃপর নিজেও তজ্জন্যে সবর করার সংকল্প গ্রহণ কর, যাতে পূনরায় সেই তিক্ততা সৃষ্টি না হয়।

পক্ষান্তরে মুক্ত করা সিদ্ধান্ত হলে তার বিধি-সম্মত ও সুন্নত-সম্মত পন্থা এই যে, তাকে লাঞ্ছিত ও হেয় করে অথবা গাল-মন্দ দিয়ে গৃহ থেকে বহিষ্কার করো না;বরং সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে বিদায় কর।

আর পবিত্র কোরআনের অন্যান্য আয়াত দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, তাকে কোন বস্ত্র জোড়া দিয়ে বিদায় করা কমপক্ষে মুস্তাহাব এবং কোন কোন অবস্থায় ওয়াজিবও।

ফিকাহর কিতাবাদিতে এর বিবরণ পাওয়া যাবে।

সপ্তম বিধান : আলোচ্য আয়াতে বিবাহে রাখা অথবা মুক্ত করে দেয়ার দ্বি-বিধ ক্ষমতা দেয়া থাকে এবং পূর্ববর্তী

لَعَلَّ ٱللَّهَ يُحۡدِثُ بَعۡدَ ذَٰلِكَ أَمۡرٗا (سُورَةُ الطَّلَاقِ : ١)

“হয়তো আল্লাহ্্ এই তালাকের পর কোন নতুন উপায় করে দেবেন।” (সূরা আত্-তালাক্ব : ১)

এ আয়াত থেকে প্রসঙ্গক্রমে বোঝা গেল যে, আল্লাহর উদ্দেশ্য হচ্ছে তালাক যদি দিতেই হয়, তবে এমন তালাক দিবে- যাতে প্রত্যাহার করার অধিকার থাকে।

আর এর সুন্নত-সম্মত পন্থা এই যে, পরিষ্কার ভাষায় কেবল এক তালাক দিবে এবং সাথে সাথে রাগ-গোস্বা প্রকাশার্থে এমন কোন বাক্য বলবে না,

যা বিবাহকে সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন করার অর্থ জ্ঞাপন করে।

وَأَشۡهِدُواْ ذَوَيۡ عَدۡلٖ مِّنكُمۡ وَأَقِيمُواْ ٱلشَّهَٰدَةَ لِلَّهِۚ (سُورَةُ الطَّلَاقِ : ٢)

“এবং তোমাদের মধ্যে থেকে দু’জন নির্ভরযোগ্য লোক সাক্ষী রাখবে। আর

তোমরা (সর্বাবস্থায়) আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দিবে।” (সূরা আত্-তালাক্ব : ২) অর্থাৎ, মুসলমানদের মধ্য থেকে দু’জনকে সাক্ষী করে নাও এবং তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সঠিক সাক্ষ্য কায়েম কর।

অষ্টম বিধান : এই আয়াত থেকে জানা গেল যে, ইদ্দত সমাপ্ত হওয়ার সময় প্রত্যাহার করা সিদ্ধান্ত হোক কিংবা মুক্ত করা,

উভয় অবস্থাতে এই কাজের জন্যে দু’জন নির্ভরযোগ্য সাক্ষী রাখতে হবে।

অধিকাংশ ইমামের মতে এই বিধানটি মুস্তাহাব, এর উপর প্রত্যাহার নির্ভরশীল নয়।

প্রত্যাহারের অবস্থায় সাক্ষী করার তাৎপর্য এই যে, পরবর্তীকালে স্ত্রী যাতে প্রত্যাহার অস্বীকার করে বিবাহ চূড়ান্তরূপে ভঙ্গ হওয়ার দাবী না করে বসে।

আর মুক্ত করার অবস্থায় এ জন্যে সাক্ষী করতে হবে, যাতে পরবর্তীকালে স্বয়ং স্বামীই দুষ্টুমীচ্ছলে অথবা স্ত্রীর ভালোবাসায় পরাভূত হয়ে দাবী না করে বসে যে,

সে ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই প্রত্যাহার করেছিল। আর সাক্ষীদ্বয়ের জন্যে

ذَوَيۡ عَدۡلٖ (سُورَةُ الطَّلَاقِ : ٢)

“দু’জন নির্ভরযোগ্য সাক্ষী” (সূরা আত্-তালাক্ব : ২) বলে ব্যক্ত করা হয়েছে যে,

শরীয়তের পরিভাষা অনুযায়ী সাক্ষীদ্বয়ের নির্ভরযোগ্য হওয়া জরুরী। অন্যথায় তাদের সাক্ষ্য অনুযায়ী কোন বিচারক ফায়সালা দিবে না।

وَأَقِيمُواْ ٱلشَّهَٰدَةَ لِلَّهِۚ (سُورَةُ الطَّلَاقِ : ٢)

“তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দিবে।” (সূরা আত্-তালাক্ব : ২) এ বাক্যে সাধারণ

মুসলমানদের সম্বোধন করে বলা হয়েছে যে, যদি তোমরা কোন প্রত্যাহার কিংবা বিবাহ

বিচ্ছেদের ঘটনায় সাক্ষী হও এবং বিচারকের এজলাসে সাক্ষ্য দেয়ার প্রয়োজন হয় তবে কারও মুখ চেয়ে

অথবা বিরোধিতা ও শত্রুতার কারণে সত্য সাক্ষ্য দিতে বিন্দুমাত্রও কুণ্ঠিত হয়ো না।

ذَٰلِكُمۡ يُوعَظُ بِهِۦ مَن كَانَ يُؤۡمِنُ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۚ (سُورَةُ الطَّلَاقِ : ٢)

“ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে।” (সূরা আত্-তালাক্ব : ২) অর্থাৎ, উপরোক্ত বিষয়বস্তু দ্বারা সে ব্যক্তিকে উপদেশ দান করা হচ্ছে,

যে আল্লাহ্ ও পরকাল দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে। এতে বিশেষভাবে পরকাল উল্লেখ করার

কারণ এই যে, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার আদায় আল্লাহ্-ভীতি ও পরকাল চিন্তা ব্যতীত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে না।

وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجۡعَل لَّهُۥ مَخۡرَجٗا وَيَرۡزُقۡهُ مِنۡ حَيۡثُ لَا يَحۡتَسِبُۚ (سُورَةُ الطَّلَاقِ : ٢-٣)

“আর যে আল্লাহ্্কে ভয় করে, আল্লাহ্ তার জন্যে নিষ্কৃতির পথ করে দিবেন,

এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দান করবেন।” (সূরা আত্-তালাক্ব : ২-৩)

অর্থাৎ, যে আল্লাহ্ তা’আলাকে ভয় করে, আল্লাহ্ তা’আলা তার জন্যে প্রত্যেক সংকট ও বিপদ থেকে নিষ্কৃতির পথ করে দেন এবং তাকে ধারণাতীত রিযিক দান করেন।

(تَقْوَى) ‘তাকওয়া’ শব্দের আসল অর্থ আত্মরক্ষা করা। শরীয়তের পরিভাষায় গোনাহ্ থেকে আত্মরক্ষা করার অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

আল্লাহর সাথে সম্বন্ধযুক্ত হলে এর অনুবাদ করা হয় আল্লাহ্কে ভয় করা। উদ্দেশ্য আল্লাহ্

তা’আলার অবাধ্যতা ও গোনাহ্ থেকে বেঁচে থাকা ও ভয় করা।

আলোচ্য আয়াতে (تَقْوَى) তথা আল্লাহ্-ভীতির দু’টি কল্যাণ বর্ণিত হয়েছে। (এক) খোদা-ভীতি অবলম্বনকারীর জন্যে আল্লাহ্ তা’আলা নিষ্কৃতির পথ করে দেয়। কি থেকে নিষ্কৃতি?

এ সম্পর্কে সঠিক কথা এই যে, দুনিয়ার যাবতীয় সংকট ও বিপদ থেকে এবং পরকালের সব বিপদাপদ থেকে নিষ্কৃতি।

(দুই) তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দান করেন, যা বান্দার কল্পনায়ও থাকে না।

এখানে রিযিকের অর্থও ইহকাল এবং পরকালের যাবতীয় প্রয়োজনীয় বস্তু।

আলোচ্য আয়াতে মুমিন-মুত্তাকীর জন্যে আল্লাহ্ তা’আলার এই ওয়াদা ব্যক্ত হয়েছে যে,

তিনি তাঁর প্রত্যেক সমস্যাও সহজসাধ্য করেন এবং তার অভাব-অনটন পূরণের দায়িত্ব

তালাকের আবশ্যকতা, বৈধতা এবং শরীয়ত সমর্থিত পরিস্থিতিসমূ

গ্রহণ করে এমন পথে তার প্রয়োজনাদি সরবরাহ করেন- যা সে ধারণাও করতে পারে না। (তাফসীরে রূহুল মা’আনী)

আর আলোচ্য আয়াতের তাফসীরে হযরত আবু যর গেফারী (রা.) নবী করীম (সা.) থেকে নিম্নাক্ত হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন :

قَالَ أَبُو ذَرٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: جَعَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتْلُو هَذِهِ الْآيَةَ {وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ} [سُورَةُ الطَّلَاقِ : ٣] قَالَ: فَجَعَلَ يُرَدِّدُهَا حَتَّى نَعَسْتُ فَقَالَ: ্রيَا أَبَا ذَرٍّ، لَوْ أَنَّ النَّاسَ أَخَذُوا بِهَا لَكَفَتْهُمْগ্ধ هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحُ الْإِسْنَادِ. (مُسْتَدْرَك الحَاكِم فِيْ كِتَابِ التَّفْسِيْرِ : ٣٨١٩)

“রাসূলুল্লাহ্ (সা.) উক্ত আয়াত অর্থাৎ, “আর যে আল্লাহ্্কে ভয় করে, আল্লাহ্্ তার জন্যে নিষ্কৃতির পথ করে দেবেন

এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দান করবেন।” (সূরা আত্-তালাক্ব : ২-৩) বার বার পাঠ করতে লাগলেন,

দীর্ঘক্ষণ পাঠ করার দরুন এক সময় আলস্যে আমার হাই আসতে লাগলো, তখন তিনি এরশাদ করলেন, হে আবু যর! যদি মানুষ এই আয়াতের মর্ম উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় তাহলে তার যাবতীয় প্রয়োজনের জন্যে এই আয়াতই যথেষ্ট।” (মুস্তাদরাক-হাকেম, কিতাবুত-তাফসীর : ৩৮১৯)

আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন আমাদের দাম্পত্য জীবনের সকল ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু

আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাম্পত্য জীবনের আদর্শ অনুসরণ করে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।