নামাজ আদায়ে কিভাবে আমরা মনোযোগী হতে পারি?

385
নামাজ আদায়ে কিভাবে আমরা মনোযোগী হতে পারি?

আমরা নামাজ এ দাঁড়ালে অনেক সময় আমাদের মাথায় এলোমেলো চিন্তাভাবনা চলে আসে। নানান কিছু মনে পড়ে যায়। এজন্য মাঝে মাঝে আমরা নামাজের রাকাত সংখ্যাই ভুল হয়ে যায়। অনেকেই আবার নামাজে মনোযোগহীনতায় আক্রান্ত।

এক হাদিসে রাসুল (সাঃ) এটিকে শয়তানের ছিনতাই বলে উল্লেখ করেছেন ।

এ বিষয়ে ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি (রহ.) তার বিখ্যাত ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এতে তিনি ছয়টি বিষয়ের কথা বর্ণনা করেন, যেগুলোর প্রতি গুরুত্ব দিলে নামাজে মনোযোগ ধরে রাখা যায়।

নামাজ আদায়ে মনোযোগী

নামাজে হৃদয়ের উপস্থিতি ও একাগ্রতা

একাগ্রতা হলো নামাজের প্রাণ। এ সম্পর্কে রাসুল (সাঃ) বলেন, এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করো যেন তাকে তুমি দেখতে পাচ্ছো। আর যদি দেখতে না পাও, তবে তিনি যেন তোমাকে দেখতে পাচ্ছেন।

                                                    বুখারি হাদিস-৫০  মুসলিম হাদিস-৮) 

প্রতিটি মানুষের মন-মস্তিষ্ক কখনো বেকার থাকে না। আর নামাজে দাঁড়ালে শয়তান বারবার মানুষের মনোযোগ বিভিন্ন দিকে ফিরিয়ে নিতে চায়। কিন্তু যেকোনোভাবে আমাদেরকে মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করতে হয়।

সুতরাং নামাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই কল্পনা (মুখে উচ্চারণ ছাড়া) ধরে রাখার অনুশীলন করুন,  যে আল্লাহ আমাকে দেখছেন।

দাঁড়ানো থেকে রুকুতে যাওয়ার আগে, রুকু থেকে সেজদায় যাওয়ার আগে কিংবা সেজদা থেকে বসার আগে, প্রত্যেক অবস্থান পরিবর্তনের পূর্বে মনের অবস্থাটা দেখে নিন যে কল্পনাটা আছে কি না; যদি না থাকে তাহলে আবার নিয়ে আসুন। 

এভাবে অনুশীলনের মাধ্যমে নামাজ শেষ করার আগ পর্যন্ত নিজের চেষ্টা অব্যাহত রাখুন। 

রাসুল (সাঃ) বলেন,  “যে সুন্দরভাবে অজু করে অতঃপর মন ও শরীর একত্র করে (একাগ্রতার সঙ্গে) দুই রাকাত নামাজ আদায় করে, (অন্য বর্ণনায় এসেছে যেই নামাজে ওয়াসওয়াসা স্থান পায় না) তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়”

                                      নাসায়ি হাদিস-১৫১ বুখারি-(১৯৩৪)

(অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়)।

নামাজ আদায়ে মনোযোগী

বিশুদ্ধ উচ্চারণে পড়ার চেষ্টা

বিশুদ্ধ উচ্চারণ অন্তরের একাগ্রতা আরও দৃঢ় করে। অন্তত সুরা ফাতেহা ও তাসবিহগুলোর অর্থ বুঝে পড়ার চেষ্টা করা দরকার। 

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘স্পষ্টভাবে ধীরে ধীরে কোরআন তিলাওয়াত করো।

                                                                     সুরা মুজ্জাম্মিল আয়াত-(৪)

হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) প্রতিটি সুরা তারতিলসহ তিলাওয়াত করতেন।

                                                            মুসলিম -(৭৩৩) তিরমিজি-(৩৭৩)

এ ব্যাপারে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা বলেন, “আমি নামাজকে আমার এবং আমার বান্দার

মধ্যে দুই ভাগে ভাগ করেছি। বান্দা আমার কাছে যা কামনা করবে, তাই পাবে। 

যখন আমার বান্দা বলে সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি সারা বিশ্বের মালিক। 

তখন আল্লাহ বলেন, ‘বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। 

বান্দা যখন বলে, পরম করুণাময় অসীম দয়াবান। 

তখন আল্লাহ বলেন, ‘বান্দা আমার গুণগান করল’। 

বান্দা যখন বলে, বিচার দিবসের মালিক।

তখন আল্লাহ বলেন, ‘বান্দা আমাকে যথাযথ মর্যাদা দান করেছে’। 

বান্দা যখন বলে, আমরা কেবল আপনারই ইবাদত করি এবং কেবল আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি। 

আল্লাহ বলেন, ‘এটি আমার ও আমার বান্দার মধ্যে আর আমার বান্দা যা চাইবে, তাই পাবে। ’ 

বান্দা যখন বলে, আপনি আমাদের সরল পথপ্রদর্শন করুন। এমন ব্যক্তিদের পথ, যাদের আপনি পুরস্কৃত করেছেন। তাদের পথ নয়, যারা অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্ট হয়েছে। 

আল্লাহতায়ালা তখন বলেন, ‘এটা আমার বান্দার জন্য আর আমার বান্দা যা প্রার্থনা করবে তাই পাবে।

                                                                      মুসলিম-(৩৯৫) মিশকাত-(৮২৩)

নামাজ আদায়ে মনোযোগী

নামাজে আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন  

আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা বিনীতভাবে আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হও। 

                                                                                              সুরা বাকারা আয়াত-(২৩৮)

কাজেই নামাজে ধীর-স্থিরতা অবলম্বন জরুরি। আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন ‘নিকৃষ্টতম চোর হলো সেই ব্যক্তি, যে নামাজে চুরি করে।

তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! নামাজে কীভাবে চুরি করে? তিনি বললেন, ‘যে রুকু-সেজদা পূর্ণভাবে আদায় করে না।

                       মুসনাদে আহমাদ হাদিস-(৮৮৫)

নামাজে আল্লাহতায়ালাকে ভয় করা

প্রতিটি নামাজই হতে পারে জীবনের শেষ নামাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জনৈক ব্যক্তি সংক্ষিপ্ত উপদেশ কামনা করলে তিনি তাকে বলেন, ‘যখন তুমি নামাজে দণ্ডায়মান হবে, তখন এমনভাবে নামাজ আদায় করো, যেন এটিই তোমার জীবনের শেষ নামাজ।

           ইবনু মাজাহর বরাতে মিশকাত-(৫২২৬)

নামাজের মাধ্যমে কল্যাণ আশা করা

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।

                                                                                 সুরা বাকারা আয়াত-(৪৫) 

তাই প্রতিটি নামাজি ব্যক্তির মনে প্রাণে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা চাই যে, আল্লাহ আমার প্রতিটি প্রার্থনায় সাড়া দিচ্ছেন। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ নামাজে দাঁড়ালে সে মূলত তার প্রভুর সঙ্গে কথোপকথন করে। তাই সে যেন দেখে কীভাবে সে কথোপকথন করছে। 

মুস্তাদরাক হাকিম- সহিহুল জামে হাদিস-(১৫৩৮)

নামাজ আদায়ে মনোযোগী

নিজের গুনাহর কথা চিন্তা করা

আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হওয়ার কথা ভেবে নিজের ভেতর অনুশোচনা নিয়ে আসুন। দণ্ডায়মান অবস্থায় একজন অপরাধীর মতো মস্তক অবনত রেখে দৃষ্টিকে সিজদার স্থানের দিকে নিবদ্ধ রাখুন। 

রাসুল (সা.) দাঁড়ানো অবস্থায় সিজদার জায়গায় দৃষ্টি রাখতেন। 

                                                      তাফসিরে তাবারি-(৯/১৯৭)

ওপরে উল্লেখিত ছয়টি বিষয় অনুসরণ করলে নামাজে মনোযোগ তৈরি হবে। 

অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নামাজের সময় হলে সুন্দরভাবে অজু করে এবং একাগ্রতার সঙ্গে সুন্দরভাবে রুকু-সিজদার মাধ্যমে নামাজ আদায় করে, তার এ নামাজ আগের সব গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত না সে কোনো কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়। আর এ সুযোগ তার সারা জীবনের জন্য।

                      মুসলিম হাদিস-(২২৮)মিশকাত হাদিস-(২৮৬)

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা, আমাদের প্রত্যেককেই উক্ত বিষয় অনুসরণ করে নামজে মনোযোগী হওয়ার তওফিক দান করুক। আমিন