পরকালের জীবন | KOBORER AJAB – 4

868

আপনার কবরে জান্নাতের আলোয় আলোকিত শুধুমাত্র আপনার রবের অসীম রহমতের কারণেই এই সুখময় আবাসটি আপনার জন্য নির্ধারিত হয়েছে। আপনার কবরকে প্রসস্থ করা হয়েছে। জান্নাতের দরজা আপনার জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। আপনার কবরে সুমধুর বাতাস বয়ে চলছে। আপনার অনেক বেশি ভালো লাগছে ও অনেক গুণ তৃপ্ত আপনার অন্তরটি কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম সমুদ্র সৈকতে চেয়েও বহুগুণ বেশি সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। আল্লাহ সুবহানা তাআলার আপনার প্রতি যে অসীম অনুগ্রহ দেখিয়ে সে কথা মনে করতে থাকেন আর সে সাথে সেসব কবরবাসীদের কথা ভাবতে থাকেন যাদের পরিস্থিতি আপনার চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন। ঠিক তখনই আল্লাহর হাবিব রাসূল (সাঃ) কথাগুলো আপনার মনে পড়ে যায়। যেন আমরা সকলেই সতর্ক থাকি এ জন্য তিনি কবরের বিভিন্ন ধরনের আযাবে কিছু বর্ণনা করে গিয়েছিলেন।

সহিহ বুখারী হাদিস হতে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) একদিন স্বপ্নের মধ্যে কবরের আজাবের কিছু বর্ণনা দেখেছিলেন যা তিনি আমাদের শিক্ষা গ্রহনের উদ্দেশ্যে বলে গিয়েছেন । রাসূল সাঃ দেখলেন যে,  দুজন লোক আসলেন এবং তার দুহাত ধরে তাকে নিয়ে জেরুজালেমের দিকে যাচ্ছে। হঠাৎ তিনি দুজন লোককে দেখলেন।  এক লোক বসে আছে আর অন্য লোকটি লোহার একটি আখড়া হাতে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে থাকে লোকটি লোহার আখড়াটা নিয়ে বসে থাকা লোকটির মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল এবং লোহার আখড়াটি এমনভাবে টেনে বের করছিল যাতে করে লোকটির এক পাশের গাল সম্পূর্ণ ছেড়ে যাচ্ছিল আর এভাবে অন্য গালেও আঘাত করছিল। তার শাস্তি এভাবে চলতে থাকল। তা দেখে  রসূলাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে চাইলেন কেন তার সাথে এসব হচ্ছে? তখন তার সাথের ফেরেশতারা বলল, ব্যাখ্যা পরে হবে এখন চলুন।

এরপর তিনি উপস্থিত হলেন চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা এক লোকের পাশে। লোকটির মাথার কাছে পাথর হাতে নিয়ে অন্য একটি লোক দাঁড়িয়ে । দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি পাথরটি দিয়ে শুয়ে লোকটির মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছিল। নিক্ষিপ্ত পাথরটি দূরে গড়িয়ে যাবার পর তা তুলে নিয়ে আসতে আসতেই শুয়ে থাকা লোকটির মাথা আবার আগের মতো জোড়া লেগে যাচ্ছিল। এভাবে লোকটির মাথা বারবার ফেটে চুরমার হতে থাকল। রাসূল (সাঃ) আবারো জিজ্ঞেস করলেন এই লোকটি কে? ফেরেশতারা রাসূল (সাঃ) কে এবারও বললেন চলুন চলুন পড়ে ব্যাখ্যা করব। এরপর তারা একটি গর্তে পৌঁছলেন এবং দেখলেন একটা তন্দুলের মত গর্তের গভীরে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছিল আর সে গর্তে  অসংখ্য উলঙ্গ নর-নারী ছিল। সেই গর্ত নিচ থেকে আগুনটা তাদের কাছে দেয়ে আসছিল আর তারা অনেক জোরে জোরে চিৎকার করছিল। আবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ব্যাপারে ফেরেশতা প্রশ্ন করলেন এবং আবারো ফেরেশতারা বলল চলুন চলুন পরে সব বলছি।এরপর তারা একটি নদীর কাছে এসে উপস্থিত হলেন।  যেখান রক্ত বয়ে চলছিল।  রক্তের নদীটির মাঝখানে একটি লোক দাঁড়িয়ে ছিলো। আর নদীর তীরে অন্য একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল এবং লোকটির সামনে একটি পাথর ছিল। নদীর মাঝখানের দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি নদী থেকে বের হয়ে আসার জন্য চেষ্টা করলেই তীরে দাঁড়ানো লোকটি সে ব্যক্তির ঠিক মুখে  পাথর মারতে থাকে এতে করে সে  আবার আগের জায়গাতে ফিরে যাচ্ছিল । এভাবে সে যতবার তীরে উঠে আসতে চেষ্টা করে ততবার সে ব্যক্তি তার মুখ বরাবর পাথর মেরে আগের জায়গাতে ফিরে যেতে বাধ্য করছে।

এরপর আরো বেশ কিছু আশ্চর্য দৃশ্য দেখার পর  সবশেষে রাসূল (সাঃ)  আবারো ফেরেশতাদের কাছে যা যা দেখেছিলেন সেগুলো সম্পর্কে ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। তখন ফেরেশতারা রাসূল (সাঃ) কে বলল, আপনি প্রথমে যে লোকটির গাল ছিঁড়ে ফেলার দৃশ্য দেখলে সে ছিলেন একজন মিথ্যাবাদী। সে সবসময় মিথ্যা কথা বলে বেড়াতো এবং তার বলা মিথ্যা কথাগুলো প্রতিনিয়ত দূর-দূরান্তে পৌঁছে যেত। এ কারনে সে ব্যক্তি কবরে কিয়ামত পর্যন্ত এভাবেই কবরে শাস্তি পেতে থাকবে। এরপর যে ব্যক্তিকে পাথর মেরে মাথা ভেঙে ফেলা হচ্ছিল সে হলো এমন ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সুবহানা তাআলা  কোরআন শিক্ষা দিয়েছিলেন কিন্তু  সে ব্যক্তি রাতের বেলায় কোরআন তেলাওয়াত না করেই ঘুমিয়ে যেত এবং দিনের বেলায় কোরআন অনুসারে সে কোন আমল করত না । এ জন্য সেও এভাবেই কেয়ামত পর্যন্ত কবরে শাস্তি পেতে থাকবে। ঠিক এর পর গর্তের ভেতর আপনি যাদেরকে দেখেছিলেন তাঁরা সবাই ছিল ব্যভিচারী। আর রক্তের নদীতে যাদের আপনি দেখেছেন তারা হলো সুদখোর।

সহিহ বুখারী ও  মুসলিম শরিফের আরেকটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে,  রাসূল (সাঃ ) একদিন দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন,  এই দুই কবরবাসীদের অনেক শাস্তি দেয়া হচ্ছে কিন্তু তারা এমন পাপের জন্য শাস্তি পাচ্ছে যা তারা একটু চেষ্টা করলেই সে কাজ থেকে বিরত থাকতে পারত। এদের মধ্যে একজন অন্যে জনের সম্পর্কে নামীমা অর্থাৎ মিথ্যা গল্প বলে বেড়াতো আর অন্যজন প্রকৃতির ডাকে সাড়া প্রদানের পর ঠিক ভাবে নিজেকে ধুয়ে নিত না। না। বারযাখের জীবনে চুরি করার শাস্তিও বেশ ভয়ঙ্কর । সহিহ  বুখারী ও মুসলিমের আরও একটি  হাদীসে বর্ণিত আছে,  খাইবারের যুদ্ধে রিফআ ইবনে যাইন নামের একজন দাস শহীদ হন । সে তো শহীদের মর্যাদা পেয়ে গেল এই বাকি সাহাবীরা তার প্রশংসা করছিলেন।  তখন রাসূল (সাঃ ) বললেন, শহীদ হওয়া সত্বেও সে এই মুহূর্তে শাস্তি পাচ্ছে। কারণ সে একদিন এক ছোট কাপড় চুরি করেছিল যার কারণে সেই কাপড় আজ আগুন হয়ে তাকে জালিয়ে দিচ্ছে। রাসূল (সাঃ ) তার এসরা ও মের’আজের যাত্রায় একদল লোকদেরকে দেখেছিলেন যে আগুনের কাঁচি দিয়ে তাদের ঠোঁট কেঁটে ফেলা হচ্ছিল । তখন জিবরাঈল (আঃ) রাসূল (সাঃ ) কে  বলেছিলেন, তারা নিজেরা ভালো কাজগুলো করত না কিন্তু  তোমার উম্মতকে ভালো কাজ করার উপদেশ দিত এবং তারা কুরআন পড়ত কিন্তু তার অর্থ বুঝত না। সুতরাং এই আযাবগুলো ভয়ঙ্কর ।

আমরা শুধু আল্লাহ সুবহানা তাআলার রহমত এবং ভালোবাসার কথাই শুনতে চাই কিন্তু কবরের আজাবের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। আমরা অনেকেই আবার প্রশ্ন করে ফেলি, যে আল্লাহ সুবহানা তাআলা আমাদের মা-বাবা  চেয়েও অনেক অনেক গুণ বেশি ভালোবাসেন সে আল্লাহ আমাদেরকে কেন এমন ভয়াবহ শাস্তি দেবেন?। আবার কেউ কেউ  বলেন ইসলাম তো শান্তির ধর্ম তাহলে এখানে কেন পুড়িয়ে ফেলা, কেটে ফেলার মতো  এত ভয়ঙ্কর শাস্তি  কথা কেন বলা হয়?

মুলত আমরা যখন আল্লাহ সুবহানা তাআলা আদেশ অমান্য করি সে কাজটা কতটুকু কুৎসিত তা  দুনিয়ায় থাকা অবস্থায় আপনার কাছে স্পষ্টভাবে বুঝার উপায় নেই। আল্লাহ সুবহানা তাআলা কতটা  মহান এবং তার  আদেশ অমান্য করা কত ভয়ঙ্কর কাজ এবং এর পরিনতি কতোটা কুৎসিত হতে পারে তা আমরা দুনিয়ার জীবনে বুঝতে পারি না ।  আমরা তো শুধু আল্লাহ সুবহানা তাআলার অসীম রহমতসমূহ নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি কিন্তু  তার ন্যায় বিচারের কথা নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি না। সুতরাং কোন খারাপ কাজ করার পরিণতি হবে সেই কবরের আজাবের মতোই ভয়ঙ্কর। কিন্তু আল্লাহ সুবহানা তাআলা  যেহেতু আমাদেরকে খুব ভালোবাসেন তাই তিনি আমাদের জান্নাতে যাওয়ার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকেন। এ জন্যই তিনি আমাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে কোন শাস্তির ব্যবস্থা করেন না বরং আমাদেরকে পুরো জীবনটা দিয়ে দেন এবং তার দিকে ফিরে আসার আহবান করতে থাকেন। বিভিন্নভাবে আমাদের আহবান করতে থাকেন এবং আমরা ফিরে আসা মাত্রই তিনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দেন। এবং এরপরেও যখন আমরা আল্লাহ্‌ সুবহানা তাআলার আহ্ববানে সারা না দিয়ে তার আদেশ অমান্য করতেই থাকি তখনও তিনি আমাদের কাছে তার পবিত্র বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দেন যে, আমরা নিজেদেরকে কতটা ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছি।

 

অথচ আমরা সেই পরিণতির গুলোর ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করে বরং বলে যাচ্ছি  আমাকে কেন এত ভয়ঙ্কর কথা বলা হচ্ছে?

কেন এত শাস্তি  কষ্ট চিত্র আমার সামনে তুলে ধরা হচ্ছে?

এই সকল ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরার পেছনে আল্লাহ্‌ সুবহানা তাআলার যে  এক অকৃত্তিম মমতা ও অসীম রহমত রয়েছে তা আমরা কখনো বুঝতে চেষ্টা করি না। তবে একদিন সেই সময় আসবে যেদিন প্রতিটি মানুষ সেই সত্যকে বুঝতে পারবে ও কঠিন বাস্তবতা তার পূর্ণাঙ্গ রূপ নিয়ে প্রতিটি মানুষের সামনে উপস্থিত হবে।  কিয়ামতের দিবস,শেষ বিচারের দিবস  নামে পরিচিত  সেই দিনটিকে নিয়ে পরবর্তী পর্বগুলোতে নিয়ে আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ্‌ ।