বারসিসার ঘটনা শয়তানের ফাঁদ | Barsisa Tricked By Shaitan | The Story of Barsisa

355

বারসিসা ছিল বনি ঈস্রাইল এর সময়কার একজন বিখ্যাত ইসলামিক স্কলারস ও একজন ধার্মিক আল্লাহ্‌র বান্দা। যিনি আল্লাহ্‌র ভয়ে সর্বদা কাঁদতেন।

তিনি ছিলেন অত্যাধিক পরহেজগার একজন দরবেশ। তাকে আমরা এই বর্তমান যুগের জগত বিক্ষ্যাত শায়খ দের সাথে তুলনা করতে পারি।

আজ আমি এই ব্যক্তির জীবনের সাথে ঘটে যাওয়া একটি বাস্তব ও চমৎকার ঘটনা নিয়ে আলোচনা করব। যা আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে আমাদের ঈমান নিয়ে ভাবতে আমাদের সহায়ক হবে।

তাই এই ঘটনা শোনার পর আপনি কখনো বারসিসা কে নিয়ে ভাববেন না। বরং নিজের সম্পর্কে সর্বদা ভাববেন এবং নিজেকে বারসিসার জায়গায় দার করিয়ে দেখবেন।

তাই গল্পটি শুরু করা যাক, বারসিসা ছিলেন বনী ইসরাইলের যুগের জগত বিখ্যাত একজন আলেম। যিনি সর্বদা আল্লার ইবাদাত করতেন। তাঁর সম্পর্কে ঐ যুগের সবাই অবগত ছিল।  তাঁর নিজস্ব একটি ইবাদাতখানা ও ছিল, যেখানে দিন – রাত  আল্লাহ্‌র ইবাদাত করা হতো।

তখন ঐ শহরের বসবাসরত ৩ ভাই তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, তাঁরা জিহাদে যাবে। কিন্তু তাদের একটি পিছু টান ছিল, সেটা ছিল তাদের ৩ ভাই এর একটি আদরের বোন।

তাঁরা এখন ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল। যদি তাঁরা জিহাদে যায়, তবে তাদের বোনের দেখা শুনা কে করবে?

তখন তাঁরা ভাবলো যে, আমাদের বোনের দেখা শুনার জন্য বারসিসার চাইতে নিরাপদ লোক আর কে হতে পারে?

কারন তিনি একজন বিখ্যাত আলেম, পরহেজগার আল্লাহ্‌ ভক্ত একজন মানুষ। তাঁর ভিতর আল্লাহ্‌র ভয় আছে, তাঁর চাইতে নিরাপদ মানুষ আর কেউ হতেই পারেনা এবং তাঁর ব্যাপারে পুরো শহর অবগত।

 

এরপর তাঁরা বারসিসার নিকট আসলো, এবং শয়তানের চালাকিও শুরু হল। দেখুন শয়তানের ধোকা কি ভয়ঙ্কর হতে পারে।

লক্ষ্য করুন শুরু টা কিভাবে হয়? তাঁরা বারসিসার নিকট আসলো এবং বলল, আমরা জিহাদের জন্য যাচ্ছি, এবং আমরা খুব হতাশায় ভুগছি। তুমি কি আমাদের বোনের দেখা শুনা করবে?

তখন বারসিসা সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেল এবং বলল, (আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতনির রাজিম। )

আমি শয়তানের অনিষ্টটা থেকে আল্লাহ্‌র নিকট পানা চাই।  অসম্ভব! এই কাজ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। তখন তাঁরা অপদস্ত হয়ে ফিরে যেতে লাগল। এরপর শয়তান বারসিসার নিকট আসল।

এবং বলল, ভাই তুমি কি করছ! এই মানুষ গুলো কে দেখছ? তাঁরা জিহাদে যেতে চাচ্ছে। তাদের ভিতর আল্লাহ্‌র ভয় আছে, তাঁরা আল্লাহ্‌ কে ভয় করে, তাই তাঁরা একটি ভাল কাজে যেতে চাচ্ছে।

বারসিসা তুমি যদি তাদের বোনের দেখা শুনা না কর, তবে কে তাদের বোনের দেখা শুনা করবে?

তুমি অনেক পরহেজগার ও আল্লাহ্‌ ভীরু একজন মানুষ। যদি তাঁরা তাদের বোন কে অন্য কারো কাছে রেখে যায়, তবে যে কোন কিছু হতে পারে। তুমি কি এই ব্যাপারে একটি বার ভেবে দেখেছো? তখন বারসিসা বলল, আমার মনে হয় তাদের বোন কে আমার দেখা শুনা করা উচিৎ।

কারন তাঁরা আল্লাহ্‌র জন্য জিহাদে যাচ্ছে। আর আমার উচিৎ তাদের কে সহযোগিতা করা।

 

শয়তানের চালাকি শুরু হল, দেখতে থাকুন কি কি করতে পারে এই শয়তান।

যখন শয়তান কারো দরজায় এসে কড়া নাড়ে, তখন শয়তান কখনো চায় না যে তুমি পুরো দরজাটা খোল। শয়তান শুধু ছোট ছোট সুযোগ খুজে মানুষ কে পথভ্রষ্ট করার জন্য।

শয়তান ছোট একটি সুযোগ পেয়ে গেছে আর ঐ বলছে বারসিসা যাও ঐ ভাইদের থামাও। তাদের বল ফিরে আসতে। তখন বারসিসা তিন ভাই কে ডেকে বলল, আমি শুধু মাত্র আল্লাহ্‌র ভয়ে, আল্লাহ্‌র জন্য তোমাদের বোনের দেখাশুনা করব। কিন্তু সে আমার সাথে থাকতে পারবেনা।

বারসিসা একজন খুবি পরহেজগার লোক ছিল যার কথা গল্পে বলে বুঝানো হয়তো সম্ভব হবেনা। এখন আপনারা আপনাদের কথা ভাবুন তো কখনো আপনার সাথে এমন কিছু হয়েছে কিনা! অর্থাৎ মন বলে করতে, কিন্তু মস্তিস্ক বাধা দেয়। বা মস্তিস্ক বলে করতে কিন্তু মন বাধা দেয়।

এরপর বারসিসা বলল, আমি তোমার বোন কে আমার সাথে রাখবো না। কিন্তু চাইলে আমার উপাসনালয়ের পিছনে একটি ঘর আছে, ওখানে থাকতে পারে।

তিনি অর্থাৎ ৩ ভাই এর বোন ওখানে থাকবেন। এবং আমি এখানে থাকব। তখন ৩ ভাই বারসিসার কথায় সম্মতি প্রকাশ করল। এবং তাদের আদরের বোন কে বারসিসার নিকট রেখে জিহাদে চলে গেল।

এরপর বারসিসা তাঁর জন্য কিছু খাবার রান্না করল, এবং সেই খাবার গুলো তাঁর দরজার বাইরে রেখে আসল। এবং ঐ বোন তাঁর খাবার বের হয়ে নিয়ে গেল। এরপর থেকে যখন সময় হত, সে সর্বদা বের হয়ে তাঁর খাবার নিয়ে পূনরায় আবার ভিতরে চলে যেত।

দেখুন তাঁর আল্লাহ্‌ ভক্তি টা কতটা চমৎকার ছিল। কিন্তু এরপর কি হল? সে তাঁর দরজা খুলে দিয়েছিল। তখন শয়তান শুধু বারসিসা কে তাঁর প্ররোচনা দিতে লাগল, আর বলল হে আমার ভাই তুমি সময় নাও। অবশেষে শয়তান বারসিসার নিকট আসল, আর সে বললঃ বারসিসা তুমি জাননা যে, তুমি যখন খাবার টা বাইরে রেখে আস। তখন সে ঘর থেকে বের হয়, এবং এসে খাবার টা ভিতরে নিয়ে যায়। আর এটা হচ্ছে একটা ফিতনা, যখন সে ঘর থেকে বের হয়, তখন সকল পুরুষ তাকে দেখে। আমার মনে হয় যদি তুমি তাঁর খাবার টা তাঁর দরজার সামনে রেখে আস, তবে এটা তাঁর জন্য অনেক বেশি উপকার হবে। যুক্তি সঙ্গত কারনে বারসিসা তখন ভাবতে লাগল, এটাই তো ঠিক। আমার এমন টাই করা উচিৎ। তখন বারসিসা খাবার রান্না করে তাঁর ঘরের কাছে গেল, এবং দরজার কড়া নেড়ে খাবার ঘরের সামনে রেখে ফিরে এলো।

কিছু দিন পর শায়খ শয়তান বারসিসা কে বলল, সেই মেয়ে কিন্তু এখনো তাঁর বাড়ির দরজা খুলে, তুমি খাবার টা একটু কষ্ট করে ভিতরে রেখে আসতে পারো না? এবং এগুলো সাময়িক সময়ের জন্য ঘটতে থাকল। কিন্তু তাদের ভাইয়েরা এখনো ফিরছেনা। অনেক সময় পার হয়ে গেসে।

এরপর শায়খ শয়তান বারসিসা কে বলতে লাগল, অনেক সময় পার হয়ে গেল। এই মহিলার কেউ নেই, না আছে কথা বলার কোন মানুষ, না আছে কোন বন্ধু, না আছে কোন সমাজ। আমার মনে হয় তাঁর সাথে তোমার কথা বলা উচিৎ আল্লাহ্‌র দিন কে ফিতনা থেকে দূরে রাখার জন্য।  না হয় সে বাইরে বের হয়ে যাবে। আর আল্লাহ্‌ ভালই জানে যে, এরপর কত রকমের ফিতনার সৃষ্টি হবে।

 

আল্লাহ্‌র দোহাই তুমি তাঁর সাথে কথা বল! তখন সে আল্লাহ্‌র ভয় এবং সমাজের ফিতনার কথা চিন্তা করে তাঁর ঘরের সামনে গেল, এবং ঘরের বাইরে থেকে তাঁর সাথে কথা বলল। তখন সেই মেয়ে টি জরে কথা বলতে লাগল। কারন সে তাঁর কথা শুনতে পাচ্ছিলনা।

আবার কিছু দিন পর, শয়তান বারসিসা কে বলল, কেন তুমি নিজে কে নিজে দোষারোপ করছ? আর তুমি বাইরে থেকে জরে কেন কথা বল? তুমি বরং তাঁর ঘরে যাও এবং তাঁর সাথে কথা বল।

 

এর কিছু দিন পর সে তাঁর ঘরের ভিতরে গেল, এবং তাঁর সাথে কথা বলল। এরপর তাদের সেই ছোট কথা গুলো আস্তে আস্তে বর হতে লাগল। কথা বলার পর সে তাকে দেখতে চাইলো।

দেখার পর ধিরে ধিরে সে তাকে স্পর্শ করতে লাগল। এবং স্পর্শ করার এক মুহূর্তে সে তাঁর সাথে জিনা করে ফেলল। আমাদের মধ্যে এমন কে আছেন যে জিনা করেন নাই?  একটু অনুভব করেন শয়তান কিভাবে ধোকা দিয়ে বারসিসা কে জিনা করায় ফেলল। জিনা করার পরে এখন সেই মেয়ের গর্ভে সন্তান চলে আসল। সে একটি ছেলে সন্তান জন্ম দিতে যাচ্ছিল।

 

তখন শয়তান আবার আসলো, এবং বারসিসা কে বলল, যখন তাঁর ভাই রা ফিরে এসে দেখবে যে এই বাচ্চার জিম্মাদার তুমি ? অথচ তোমাকে তাঁর বোনের দেখা শুনা করতে দিয়েছিল। তখন ঐ সময় তুমি কি জবাব দিবে? তখন বারসিসা শয়তান বলল, তোমার এই বাচ্চা কে মেরে ফেলা উচিৎ। তোমার সকল প্রমান মুছে ফেলা উচিৎ। তখন বারসিসা ছেলে টাকে মেরে ফেলল।

 

সে এখন জিনা এবং খুন দু’টিই করে ফেলল। কিছুক্ষন পর শয়তান আসল আর বারসিসা কে বলল, তোমার কি সত্যি মনে হয় যে মেয়ে টি থেমে থাকবে? এই কই দিনে তাঁর সাথে যা যা হয়েছে এই সকল ব্যাপারে? সে কি তাঁর ভাইদের বলবে না এই সব কিছুর ব্যাপারে? তখন বারসিসা বলল, তাহলে আমি এখন আর কি করব? তাকেও মেরে ফেলব? জিনা এবং দু’টি খুন তাঁর দ্বারা সংঘটিত হল।

 

তাঁর ভাইরা যুদ্ধ থেকে ফিরল এবং বলল, আমাদের বোন কোথায়? বারসিসা বলল, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তোমার বোন অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, এবং আল্লাহ্‌ তাকে তাঁর কাছে ডেকে নিয়েছেন। বারসিসা একজন জগত বিখ্যাত মনিষী ছিলেন তিনি কখনো মিথ্যা বলতে পারেন না। এবং এই কথা শোনার পর তাঁর ভাইদের কাছেও কিছু বলার রইল না। তখন তাঁরা জানতে চাইল কোথায় তাঁর কবর? তখন বারসিসা একটি ভুল কবর দেখিয়ে বলল, ঐ তো তোমাদের ঐ জায়গায় চির নিদ্রায় শায়িত আছে। তখন তাঁরা বোনের জন্য দোয়া করল, এবং ঘরে ফিরে গেল।

পরের দিন সকালে এক ভাই বলতেসে যে, যান আমি একটি আজব স্বপ্ন দেখেছি গতকাল রাতে? আরেক ভাই বলল, আমিও একটি আজব স্বপ্ন দেখেছি। তুমি কি দেখেছো? একজন বলল, আমি দেখেছি যে, আমার বোন অসুস্থ ছিলনা। সে গর্ভধারিণী ছিল, এবং তাঁর একটি ছেলে সন্তান হয়ে ছিল। তাঁর সন্তান কে হত্যা করা হয়েছে। এবং আমি আরো দেখেছি যে, তাঁর কবর ঐ জায়গায় না যেখানে বারসিসা আমাদের দেখিয়েছিল, তাঁর কবর অন্য কোথাও দেয়া হয়েছে। তখন অন্য ভাইরা বলতে লাগল আজব! আমিও একি স্বপ্ন দেখেছি। তখন তাঁরা বলতে লাগল, আমরা ২ জন তো আর ভুল হতে পারিনা।

তাঁরা ঐ জায়গায় গেল, যেখানে তাঁরা স্বপ্নে দেখেছিল এবং সেখাঙ্কার কবর খনন করল। তখন তাঁরা তাঁর বোন কে দেখতে পেল, সাথে তাঁর ছেলে কেও। তখন তাঁরা বারসিসার নিকট ফিরে গেল এবং বলল, তুমি আমাদের সাথে মিথ্যা বলেছ। এই সেই যায়গা না, চল এবার তোমাকে আমরা বিচারকের কাছে নিয়ে যাব।

 

তখন বারসিসা নিজের দিকে তাকাল, এবং ভাবতে লাগল, আমি কি করেছিলাম? যিনা, ২ টা খুন। তখন সে ভাবল, আমি এখন সব সত্য বলে দিব। তখন শয়তান মানুষ রুপে বারসিসার নিকট আসল, তখন সে বারসিসা কে বলল, তুমি যান আমি কে? সে তখন বারসিসা কে বলল, আমি শয়তান। এবং আমি সেই লোক যে তোমার দ্বারা এতো গুলো কাজ করিয়েছি। এবং আমি আছি যে তোমাকে এখান থেকে বের করতে পারবে। তখন শয়তান বারসিসা কে বলল, আমি কি তোমাকে এগুলো থেকে মুক্ত করব?

 

আমার কাছে একটা অপ্সহন আছে আছে তোমার জন্য বারসিসা। তখন বারসিসা বলল, যা খুশি কর, আমাকে এখান থেকে মুক্ত কর। তখন শয়তান বারসিসা কে বলল, আমাকে সেজদা কর।

 

আমি কথা দিচ্ছি তোমাকে আমি এর থেকে মুক্তি দিব। তখন বারসিসা সেজদা দিল। তখন শয়তান বলল, অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। তুমি আজ আমাকে খুশি করে দিয়েছ।

আসসালামু আলাইকুম, এরপর তাকে হত্যা করা হল। তাঁর জীবনে শেষ মুহূর্তে কি ঘটেছিল?

তাঁর শুধু গুনাহের ভিতরে বাকি ছিল, শিরক আর কুফ্রি করা। জেটা তাঁর দ্বারা শয়তান করাল। অর্থাৎ তাঁর ঈমান টাকে নষ্ট করে দিয়ে বিদায় নিল।