মহানবী (সা.)-এর হিজরত ইসলামের এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়

323
মহানবী সাএর হিজরত
মহানবী সাএর হিজরত

ইসলামের এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হলো মহানবী (সা.)-এর হিজরত

আহমদ বদরুদ্দীন খান

(সম্পাদক : মাসিক মদীনা)

মক্কা মুকাররামা হতে মদীনা মুনাওয়ারায় রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর হিজরত, যা ইসলামের ইতিহাসে ‘হিজরতে-নববী’ নামে পরিচিত। এই পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ হিজরতের মাঝে মুসলিম-উম্মাহর জন্য ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে রয়েছে সর্বোচ্চ অনুপ্রেরণা, সুমহান আদর্শ, ঐশী হেকমত ও এমন এক সুদূর প্রসারী দাওয়াতী কার্যক্রমের সুপরিকল্পিত নকশা- যা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দাওয়াতী কর্ম-কৌশল হিসেবে স্বীকৃত। সেই সাথে প্রতি যুগের প্রত্যেক মুমিনের যাপিত-জীবনের সর্বোচ্চ আশা-আকাংখার প্রতীক ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের পরিপূর্ণ নকশা-ভিত্তিক পরিকল্পনা। তাই প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সকল কার্যক্রমে হিজরতে নববীর আবেদন, তাৎপর্য ও গুরুত্ব গভীরভাবে অনুধাবনের দাবী রাখে।

আর তাই রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর পর রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামের সবচেয়ে আলোকিত এবং আলোচিত ব্যক্তিত্ব দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এক রাষ্ট্রীয় ফরমানের মাধ্যমে হিজরী সনের প্রবর্তন করেন এবং পবিত্র হিজরতের অন্তর্নিহিত গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্যক অনুধাবন করতঃ ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় পরিচালিত যাবতীয় কর্মকান্ড হিজরতে নববীর সম্পৃক্ততাকে অত্যাবশ্যকীয়রূপে নির্ধারণ করেন।

আরবী ভাষায় (اَلْهِجْرَة) আল হিজরা তথা হিজরতের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, ত্যাগ করা, পরিহার করা। এতদর্থে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন :

وَٱلرُّجۡزَ فَٱهۡجُرۡ (سُورَةُ المُدَّثِّرِ : ٥)

অর্থাৎ, “হে রাসূল! অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন।” (সূরা আল মুদ্দাসসির : ৫) আর পরিহার করা অর্থে পবিত্র কোরআনের অন্যত্র আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন :

وَٱهۡجُرۡهُمۡ هَجۡرٗا جَمِيلٗا (سُورَةُ المُزَّمِّلِ : ١٠)

অর্থাৎ, “কাফেররা যা বলে, তজ্জন্যে আপনি ধৈর্যধারণ করুন এবং সুন্দরভাবে তাদের পরিহার করে চলুন।” (সূরা আল মুযযাম্মিল : ১০)

আর হিজরতের পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে, এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তিত হওয়া অথবা এক দেশ হতে অন্য দেশে স্থানান্তরিত হওয়া। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর পবিত্র হিজরত শুধুমাত্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর অর্থে সীমাবদ্ধ ছিলনা বরং তাঁর হিজরত ইসলামের ইতিহাসে এতটাই ব্যাপক ও অর্থবহ ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিষয় ছিল, যে ঘটনা মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল বিশ্ব-সভ্যতার। পরিবর্তিত করে দিয়েছিল তৎকালীন বিশ্ব-পরিস্থিতির সার্বিক ইতিহাস ঐতিহ্যের গতিধারা। আমূল পাল্টে দিয়েছিল বিশ্ব-সভ্যতার চেহারা। কারণ, সে হিজরত কেবল মাত্র স্বশরীরে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ও নিবেদিত-প্রাণ একদল সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের মক্কা মুকাররামা থেকে মদীনা মুনাওয়ারায় স্থানান্তর অর্থে ছিলনা বরং শরীয়তের পরিভাষায় এবং তৎকালীন বাস্তবতার নিরিখে এই ঐতিহাসিক হিজরত ছিল ইসলামের আওয়াজকে দুর্বল অবস্থা থেকে শক্তিশালী অবস্থানে স্থানান্তর করা।

এক আল্লাহতে বিশ্বাসী মুমিনদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ শক্তিশালী সম্প্রদায়ে রূপান্তরিত করা। পরস্পর বিচ্ছিন্ন অবস্থা থেকে মুসলমানদের ঈমানী চেতনায় ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করা। মানব রচিত বিভিন্ন গোত্রীয় শাসন ব্যবস্থার নাগপাশ থেকে মুক্ত করে বিশ্ব মানবতাকে এক আল্লাহ্ তা’আলার নির্দেশিত শাসন ব্যবস্থায় নিয়ে আসা। মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে সর্বশক্তিমান প্রতিপালকের দাসে পরিণত করা। মোটকথা, ইসলামের মর্মবাণী মক্কার গন্ডী থেকে সমগ্র বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়ার ঐশী মহা-পরিকল্পনার সর্বপ্রথম বাস্তবমুখী পদক্ষেপ ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর পবিত্র হিজরত।  

মহানবী [সা]এর হিজরত

সীরাতে রাসূল (সা.)-এর বিভিন্ন দিক নিয়ে বাংলা ভাষায় যতটুকু আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। সেই তুলনায় সীরাতে রাসূল (সা.)-এর এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে তেমন কোন গবেষণা বা তথ্যবহুল লেখা আমরা ইতোপূর্বে দেখিনি। অথচ এই হিজরতই ছিল মহানবী (সা.)-এর পবিত্র সীরাত তথা ঘটনাবহুল নবুওয়াতী যিন্দেগীর প্রকাশ্য বিজয় ও সফলতার সর্বপ্রথম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সোপান। যে ঘটনা নির্যাতিত মযলুম উম্মাহর এক যুগের পরাজয় ও পরাধীনতাকে পাল্টে দিয়েছিল গর্বিত বিজয় ও আত্মপ্রত্যয়ে। যে কালজয়ী ঘটনা সভ্যতার ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। মুসলিম-উম্মাহর ভাগ্যাকাশের উজ্জল সূর্যতুল্য সেই পবিত্র হিজরত ও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সম্পর্কে আমাদের কতটুকুই বা জানা আছে? ইসলামের অগ্রযাত্রা ও বিজয়ের প্রতীক এই হিজরত ও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সম্পর্কে আমাদের আরও গভীর অধ্যায়ন ও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, হিজরত শুধুমাত্র নববী যুগের আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা নয় বরং সর্বকালের মুসলমানদের জন্যই হিজরতে নববী এক অসাধারণ তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কেননা, সর্বযুগেই দাওয়াতে-ইসলামীর কর্মপন্থা নির্ধারণে হিজরতের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই ইসলামের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা ও বিজয়ের সূচনাকারী এই হিজরত স্থান-কালের গণ্ডী অতিক্রম করে সর্বকালের মুসলমানদের দাওয়াতী কার্যক্রমের জন্য এক অব্যর্থ সফল কর্ম-কৌশল হিসেবে স্বীকৃত ও সমাদৃত।

অন্যদিকে মানবতা, ভ্রাতৃত্ব, সহনশীলতা ও সহমর্মীতার সর্বকালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা প্রদর্শিত হয়েছিল এই পবিত্র হিজরতের মাধ্যমে। যা সর্বকালের মানবতার ইতিহাসে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ-ব্যবস্থার সার্বিক কল্যাণ সাধনে সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হয়ে আছে। ন্যায়-ইনসাফ, সম-অধিকার, ব্যক্তি স্বাধিনতা যদি মানব-জীবনের জন্মগত অধিকার হয়ে থাকে, তাহলে প্রকৃত অর্থে দুনিয়ার বুকে সেই অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ মানুষ দেখেছিল মহানবী (সা.) ও মুহাজিরীনগণ হিজরত করে মক্কা মুকাররামা থেকে মদীনা মুনাওয়ারায় পৌছার পর।

একদিকে যেমন হিজরতের সূচনালগ্নে মুসলিম-বিদ্বেষী বৈরী শক্তির পৈশাচিকতা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছিল, ঠিক তেমনি এর পরিসমাপ্তিতে ইসলামী যিন্দেগী তথা সমাজ-ব্যবস্থার অপরূপ সৌন্দর্য বিশ্ববাসী অবলোকন করেছিল মদীনাবাসী আনসারদের হৃদয়গ্রাহী আতিথেয়তা ও অনন্য মানবিক আচরণের মাধ্যমে। আর তাই হিজরতে নববী (সা.) তথা সীরাতে-রাসূলের এই অন্যতম অধ্যায়টি কোন স্থান-কালের সাথে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সর্বকালের মযলুম মানবতার মুক্তির মূলমন্ত্র হিসেবে হিজরতে নববীর গুরুত্ব ও আবেদন সকল যুগেই সমানভাবে কার্যকর। কেননা, নবী করীম (সা.) যেমন মানব জাতির জন্য সর্বকালের সর্বোত্তম আদর্শ ছিলেন তেমনি তাঁর পবিত্র জীবনের ছোট-বড় প্রতিটি কর্মকাÐই সর্বকালে সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য ‘উসওয়ায়ে-হাসানা’ তথা সর্বোত্তম জীবন-ব্যবস্থা হিসেবে সকল শ্রেণীর বিবেকবান ব্যক্তি কর্তৃক স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত।

কেননা, মানবেতিহাসে মযলুম মানবতার মুক্তির তরে হিজরতে নববীর ন্যায় এমন উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ঘটনা আর একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য আমরা কালজয়ী মুসলিম মনীষী ইমাম ইবনে কাসীর (রাহ্.)-এর নিম্নোক্ত উক্তি থেকেই সম্যক উপলব্ধি করতে সক্ষম। তিনি তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ নামক গ্রন্থে হিজরত সম্পর্কিত আলোচনার ভুমিকায় লিখেছেন : ‘পবিত্র কোরআনকে যদি আমরা মানব-সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করি- তাহলে আমরা দেখতে পাই যে, সেই পবিত্র কোরআনের যাবতীয় হুকুম আহ্কামের ক্ষেত্রেও হিজরতের প্রভাব পূর্বাপর সুস্পষ্ট দুভাগে বিভক্ত। অর্থাৎ, মহান রাব্বুল আলামীন স্বয়ং পবিত্র হিজরতে নববীকে ইসলামের সফলতা ও অগ্রযাত্রার সুচনাকারী প্রথম বাস্তবমুখী পদক্ষেপ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।’  

হিজরতের সূচনাপর্ব : হিজরতের ন্যয় মহান ঘটনার প্রেক্ষাপট ও সুদূর-প্রসারী পরিকল্পনার সুচনা হয়েছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর পবিত্র মেরাজ গমন থেকে। কালজয়ী সীরাত বিশেষজ্ঞ ইমাম ওয়াকেদী (রাহ্.) ও ইমাম নববী (রাহ্.) মহানবী (সা.)-এর পবিত্র হিজরত সম্পর্কিত এই অসাধারণ তথ্যটি তাঁদের দীর্ঘ গবেষণার পর এভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, চাচা আবু তালেব ও প্রাণপ্রিয় স্ত্রী হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.), পরপর এ দু’জন শক্তিশালী অভিভাবক ও হিতাকাংখীকে হারাবার পর চরম অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূল বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে মহানবী (সা.) যখন নিজেকে খুব অসহায় ভাবছিলেন। তখন আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় হাবীব (সা.)-এর হৃদয়-মন প্রশান্ত ও সুদৃঢ় করতে পবিত্র মেরাজের ন্যায় এক অভূতপূর্ব ও অসাধারণ ঘটনা তথা উর্ধ-জগৎ ভ্রমণের রাজকীয় আয়োজন করলেন। মাটির তৈরী মানুষের পক্ষে যা কল্পনারও অতীত তেমনি এক অবিশ্বাস্য ও আশাতীত সম্মানজনক আমন্ত্রণ আসলো স্বয়ং মহান ¯স্রষ্টা  রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে। আর তা হচ্ছে দুনিয়াবী যিন্দেগীতেই ‘দীদারে ইলাহী’ তথা সর্বশক্তিমান স্রষ্টা মহান রাব্বুল আলামীনের সাক্ষাত ও মেহমানদারীর আয়োজন।

পৃথিবী থেকে রাব্বুল আলামীন কর্তৃক প্রেরিত বোরাক তথা বিশেষ যানে করে ফেরেশতাকূল শিরোমনি হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর ন্যায় মহান পথ-প্রদর্শক ও সফর সঙ্গীর তত্তাবধানে সুবিশাল মহাশূণ্য অতিক্রম করে প্রথম আকাশ অতপর একে একে সপ্তাকাশ ও সিদরাতুল মুনতাহা অতিক্রম করে মহান আরশের অধিপতি রাব্বুল আলামীনের শাহী দরবারে উপস্থিতি ও সাক্ষাত লাভ। সেই সাথে জান্নাত ও জাহান্নামসহ কুদরতের হাজারো নিদর্শন চর্মচক্ষে প্রত্যক্ষ করা, মহান -স্রষ্টার অসংখ্য-অগণিত ফেরেশতাকূলের দায়িত্বে পরিচালিত বৈচিত্রময় হাজারো অলৌকিক কর্মকান্ড- যা সপ্তাকাশ ও সুবিশাল সৃষ্টজগতব্যাপী পরিব্যপ্ত।

মহান ¯স্রষ্টার এই সুবিশাল ও সুশৃংখল সমরাজ্যে তাঁর একক সার্বভৌমত্বের মাঝে নিরঙ্কুশ আধিপত্য স্বচক্ষে অবলোকন করার পর পৃথিবীতে ফিরে এসে সেই জগতসমূহের তুলনায় নিতান্ত ক্ষুদ্র এই পৃথিবীর সামান্য একটি অংশে দ্বীনে ইলাহীর পরিপূর্ণ নকশায় একটি পুর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাংখা মহানবী (সা.)-এর মাঝে তীব্র হয়ে উঠে। আর সেই আকাংখা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে মহান ¯্রষ্টা কর্তৃক বহুপূর্ব থেকে নির্ধারিত পবিত্র ভু-খন্ড ‘ইয়াসরেব’ তথা পাক মদীনার ছবিই বার বার নবী করীম (সা.)-এর কল্পনায় ভেসে উঠে। আর তাই মেরাজ থেকে ফিরে আসার পর মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরতের তীব্র আকাংখা বুকে নিয়ে ইলাহী নির্দেশের অপেক্ষায় দিন গুণতে থাকেন। উল্লেখ্য যে, কোন কোন নির্ভরযোগ্য বর্ণনা মতে অপেক্ষার এই সময়টিতে ওহীর মাধ্যমে হিজরতের গন্তব্যস্থান হিসেবে খর্জুর বীথি শোভিত পবিত্র মদীনা মুনাওয়ারার একটি পুর্ণাঙ্গ চিত্র মহানবী (সা.)-কে একাধিকবার দেখানো হয়েছিল।

অন্যদিকে পাক মদীনার প্রতিটি ধুলিকণাও যেন হাজার হাজার বছরব্যাপী সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের পবিত্র পদস্পর্শে ধন্য হতে ব্যকুল হয়েছিল। মোটকথা, আল্লাহর যমীনে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে একটি পরিপূর্ণ কল্যাণমূখী ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করার যে স্বপ্নসাধ মহানবী (সা.) আজীবন নিজের মধ্যে লালন করে আসছিলেন তা বাস্তবায়নের সর্বপ্রথম বাস্তবমূখী পদক্ষেপ ছিল মক্কা থেকে মদীনা অভিমুখে তাঁর পবিত্র হিজরত।

হিজরতের প্রেক্ষাপট তৈরী বা প্রস্তুতিপর্ব : বাইআতুল-আকাবা তথা আকাবার শপথ : পবিত্র মক্কা-মুর্কারামার অদূরে মীনার পার্শ্ববর্তী আকাবা নামক স্থানে ৬২১ খ্রীস্টাব্দের জুলাই মাস ও নবুওয়াত প্রাপ্তির ১২ তম বৎসরে মদীনা মুনাওয়ারা থেকে পবিত্র হজ্ব উপলক্ষে আগত আউস ও খায্রাজ গোত্রের ১২ ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইসলামে দীক্ষিত করেন- যা ইতিহাসে ‘আকাবার প্রথম বাইআত’ নামে পরিচিত। ঠিক একই স্থানে পরবর্তী বৎসর অর্থাৎ, ৬২২ খ্রীষ্টাব্দের জুন মাস ও নবুওয়াতের ১৩ তম বর্ষের হজ্ব মৌসুমে মদীনা মুনাওয়ারা থেকে আগত ৭৩ জনের অপর এক জামাত যাতে দু’জন মহিলাও ছিলেন। মহানবী (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁকে মদীনা মুনাওয়ারায় আগমনের আনুষ্ঠানিক দাওয়াত প্রদান করেন। ইতিহাসে এটি ‘আকাবার দ্বিতীয় বাইআত’ নামে পরিচিত। বলাবাহুল্য যে, মীনার যামারাত (শয়তানকে কংকর নিক্ষেপের স্থান) হতে আনুমানিক তিন’শ মিটার মক্কার দিকে আকাবার সেই ঐতিহাসিক স্থানটি অবস্থিত।

মহানবী [সা]এর হিজরত

উল্লেখ্য যে, রাসূল (সা.) দশ বছর পর্যন্ত আরব গোত্রসমূহকে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। তাদের প্রতিটি সমাবেশে উপস্থিত হয়ে তিনি সত্য প্রচার করেন। হজ্বের মওসুমে ওকায নামক বাজারে এবং যিল মাজায বাজার ইত্যাদিতে ঘরে ঘরে যেয়ে তিনি মানুষকে সত্যের প্রতি আহবান করতে থাকেন। কিন্তু মেলায় আগতরা তার প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে সর্বপ্রকার কষ্ট দিত এবং এই বলে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত যে, প্রথমে আপন সম্প্রদায়কে মুসলমান কর। এরপর আমাদের হেদায়াতের জন্যে এসো। এভাবেই দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়ে গেল। আল্লাহ্ তা’আলা যখন ইসলামের প্রচার ও উন্নতি সাধন করার ইচ্ছা করলেন, তখন মদীনা থেকে আউস গোত্রের কয়েক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কাছে পাঠিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে দু’ব্যক্তি সে বছর ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হয়। এঁরা ছিলেন হযরত আসআদ ইবনে যুরারাহ্ (রা.) এবং হযরত সাফওয়ান ইবনে আবদে কায়েস (রা.)। পরে তাঁদের মধ্যে থেকে আরও কয়েকজন মক্কায় এলো। তাদের ছয় অথবা আটজন মুসলমান হল। নবী করীম (সা.) তাঁদের বললেন : “আল্লাহ্ তা’আলার বার্তা প্রচারে তোমরা আমাকে সাহায্য করবে কি? তাঁরা আরয করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ সা.! মদীনার দু’টি গোত্র আউস ও খাযরাজের মধ্যে এখনও গৃহযুদ্ধ চলছে। অতএব এ মুহুর্তে আপনি মদীনায় গেলে আপনার হাতে বায়আত করতে সকলের ঐকমত্য হবে না। তাই আরো এক বছর এই ইচ্ছা মুলতবী রাখুন। আমাদের পরস্পরের মধ্যে শান্তি চুক্তি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তখন আউস ও খাযরাজ সম্মিলিতভাবে ইসলাম কবুল করে নিতে পারে। আগামী বছর আমরা আবার আপনার কাছে উপস্থিত হব। এখন এ বিষয়ের মীমাংসা হতে পারবে না।

অতঃপর নও মুসলিমগণ মদীনায় ফিরে এলেন এবং মদীনায় সর্বপ্রথম মসজিদে-যুরায়ফে কোরআন তেলাওয়াত করা হল। মদীনায় ইসলাম প্রচার হোক- এটাই ছিল আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের অভিপ্রায়। সে মতে এক বছর সময়ের মধ্যে আউস ও খায্রাজের অধিকাংশ ঝগড়া-বিবাদ মিটে গেল। ওয়াদা অনুযায়ী পরবর্তী বছর ৭৩ ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর খেদমতে ইসলামে দীক্ষিত হতে আকাবার সেই ঐতিহাসিক স্থানে হাজির হলেন।

এ সকল লোক মুসলমান হয়ে মদীনায় ফিরে এলে ঘরে ঘরে ইসলামের চর্চা হতে থাকে। প্রতিটি মজলিসে ইসলামকে নিয়েই আলোচনা চলতে থাকে। ‘বাইআতে-আকাবা’ ছিল মহানবী (সা.)-এর পবিত্র হিজরত ও মদীনা মুনাওয়ারায় ইসলামের ভিত্তিপ্রস্তর ও সূচনাপর্ব। আর তাই ইসলামের ইতিহাসে ‘বাইআতুল-আকাবার’ গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা, মক্কাসহ সমগ্র আরব জাহান যখন মহানবী (সা.) ও ইসলামের বিরোধীতায় সোচ্চার। সেই অসহায় দিনগুলোতে যখন আত্মীয়-পরিজনসহ সকলেই মহানবী (সা.) ও ইসলামের মহান দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছিল। ঠিক সেই সময়টাতেই মদীনাবাসী এগিয়ে এসেছিল এবং ইসলামের সুমহান আহ্বানে সাড়া দিয়ে আন্তরিকতার সাথে মহানবী (সা.)-কে মদীনায় তাঁদের মাঝে চলে আসতে আহ্বান করেছিল। সেই সাথে এই মর্মে প্রতিশ্রতি দিয়েছিল যে, তাঁরা নিজেদের জান-মাল শক্তি-সামর্থ্য এক কথায় সর্বস্ব দিয়ে তাঁকে সাহায্য করবেন। পরবর্তীতে তাঁরা তাঁদের সেই প্রতিশ্রতি পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করেছিলেন। হিজরত থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত সহযোগীতা, আন্তরিকতা ও ভালোবাসার যে চুড়ান্ত পরাকাষ্ঠা মদীনাবাসী প্রদর্শন করেছেন, তা মানবেতিহাসে নযীর-বিহীন। মহানবী (সা.) তো বটেই, স্বয়ং আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনও তাঁদের সেই ভালোবাসা, আনুগত্য ও আন্তরিকতায় মুগ্ধ ও সন্তুষ্ট হয়ে তাঁদের প্রতি তাঁর চীরস্থায়ী সন্তুষ্টি ঘোষণা করেছেন পবিত্র কোরআনে :

وَٱلسَّٰبِقُونَ ٱلۡأَوَّلُونَ مِنَ ٱلۡمُهَٰجِرِينَ وَٱلۡأَنصَارِ وَٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُوهُم بِإِحۡسَٰنٖ رَّضِيَ ٱللَّهُ عَنۡهُمۡ وَرَضُواْ عَنۡهُ وَأَعَدَّ لَهُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي تَحۡتَهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَآ أَبَدٗاۚ ذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ (سُورَةُ التَّوۡبَةِ : ١٠٠(

“আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনসারদের মাঝে পুরাতন, এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ্্ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন কাননকুঞ্জ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত প্রস্রবণসমূহ। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই হল মহান কৃতকার্যতা।” (সূরা আত তাওবাহ্ : ১০০)  উক্ত সূরার অন্যত্র আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন :

لَّقَد تَّابَ ٱللَّهُ عَلَى ٱلنَّبِيِّ وَٱلۡمُهَٰجِرِينَ وَٱلۡأَنصَارِ ٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ ٱلۡعُسۡرَةِ مِنۢ بَعۡدِ مَا كَادَ يَزِيغُ قُلُوبُ فَرِيقٖ مِّنۡهُمۡ ثُمَّ تَابَ عَلَيۡهِمۡۚ إِنَّهُۥ بِهِمۡ رَءُوفٞ رَّحِيمٞ (سُورَةُ التَّوۡبَةِ : ١١٧(

“আল্লাহ্্ দয়াশীল নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা কঠিন মুহুর্তে নবীর সঙ্গে ছিল, যখন তাদের এক দলের অন্তর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর তিনি দয়াপরবশ হন তাদের প্রতি। নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল ও করুণাময়।” (সূরা আত তাওবাহ্ : ১১৭)

মহানবী [সা]এর হিজরত

মক্কা মুর্কারামা থেকে মদীনা মুনাওয়ারায় রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর পবিত্র হিজরত।

হিজরতের সূচনা : বাইআতুল-আকাবায় মদীনাবাসীর ইসলাম গ্রহণের সংবাদ পেয়ে কাফের কোরায়েশরা রাগে ও ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে গেল, এবং মুসলমানদের উপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। এহেন পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) সাহাবায়ে-কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের মদীনায় হিজরত করার পরামর্শ দিলেন। সাহাবীগণ আস্তে আস্তে একজন দু’জন করে গোপনে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করাও শুরু করলেন। অবশেষে মক্কায় রাসূলে করীম (সা.), হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), হযরত আলী (রা.) ও অল্পসংখ্যক সক্ষম মুসলমান ছাড়া কোন ঈমানদার ব্যক্তি বাকী রইল না। হযরত আবু বকরও (রা.) হিজরতের ইচ্ছা করেছিলেন; কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তাঁকে বললেন : আল্লাহ্ তা’আলা আমাকেও হিজরতের অনুমতি দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। সেমতে তিনি এই অপেক্ষায় রইলেন। এ সফরের জন্যে তিনি দুটি উষ্ট্রীও যোগাড় করে রেখেছিলেন। একটি নিজের জন্যে, অপরটি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর জন্যে। (সীরাতে ইবনে-হিশাম : ১ম খন্ড)

নবী করীম (সা.)-এর হিজরত : পরিস্থিতি অবগত হয়ে কাফের কোরায়েশরা পরামর্শের জন্যে দারুন-নাদওয়া বা তাদের সম্মেলন স্থলে সমবেত হল। পরামর্শ সভায় উপস্থিত নেতৃবর্গের কেউ রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে বন্দী করার পরামর্শ দিল, এবং কেউ নির্বাসনের পক্ষে মত প্রকাশ করল। কিন্তু তাদের ধূর্ত লোকেরা বলল, এটা ঠিক নয়। কেননা, তাঁকে বন্দী করলে তাঁর অনুসারিরা আমাদের উপর চড়াও হবে এবং তাঁকে ছাড়িয়ে নিবে। তাঁকে নির্বাসিত করাও আমাদের জন্যে ক্ষতিকর। কেননা, তখন মক্কার পার্শ্ববর্তী সকল আরব তাঁর চরিত্রমাধুর্য, মিষ্ট কথাবার্তা এবং কোরআনের ভক্ত হয়ে যাবে। তাঁরা সকলকে নিয়ে আমাদের উপর চড়াও হবে। আবু জাহ্ল রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে হত্যা করার পরামর্শ দিল এবং বলল, এ হত্যাকান্ডে প্রত্যেক গোত্রের এক-এক ব্যক্তি অংশগ্রহণ করবে, যাতে করে বনী আবদে-মানাফ প্রতিশোধ নিতে অক্ষম হয়ে পড়ে। উপস্থিত সকলেই আবু জাহ্লের এই পরামর্শ পছন্দ করল এবং প্রত্যেক গোত্রের এক একজন যুবককে এ কাজের জন্যে নিযুক্ত করল। তারা হত্যাকান্ডের দিনক্ষণও ঠিক করে দিল যে, অমুক রাতে এ কাজ করতে হবে। কিন্তু পয়গাম্বরগণের অদৃশ্য শক্তি সম্পর্কে এই মূর্খরা মোটেই অবগত ছিল না। এদিকে হযরত জিবরাঈল (আ.) তাদের পরামর্শসভার

যাবতীয় কার্যবিবরণী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে অবহিত করে দিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আত্মরক্ষার কৌশলও বলে দিলেন যে, আজ রাতে আপনি নিজ বিছানায় শয়ন করবেন না। আল্লাহ্ আপনাকে মদীনায় হিজরত করার অনুমতি প্রদান করেছেন।

এদিকে পরামর্শ অনুযায়ী সন্ধ্যা থেকেই কোরায়শী দুর্বৃত্তরা রাসূলে করীম (সা.)-এর গৃহ অবরোধ করে রাখলো। এ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) হযরত আলী ইবনে আবু তালেব (রা.)-কে আদেশ দিলেন, অদ্য রাতে তুমি আমার বিছানায় শয়ন করবে। তিনি এ সুসংবাদও দিলেন যে, এতে বাহ্যত তোমার প্রাণনাশের আশংকা থাকলেও বাস্তবে শত্রুরা তোমার কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না।

মহানবী [সা]এর হিজরত

হযরত আলী (রা.) একাজের জন্যে সানন্দে নিজেকে পেশ করলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর বিছানায় শুয়ে পড়লেন। কিন্তু এখন সম্মুখে এই সমস্যা ছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এই নিদ্রিত অবরোধ থেকে কিভাবে বের হবেন? আল্লাহ্ তা’আলা একটি মু’জিযার সাহায্যে এর সমাধান করলেন। মু’জিযা তথা অলৌকিক ঘটনা ছিল এই যে, খোদায়ী আদেশে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এক মুষ্টি মাটি নিয়ে গৃহের বাইরে এলেন এবং অবরোধকারীরা তাঁর সম্পর্কে যেসব কথা-বার্তা বলছিল, সেগুলোর জওয়াব দিলেন। কিন্তু আল্লাহ্ তা’আলা তাদের দৃষ্টি ও চিন্তাকে তাঁর দিক থেকে ফিরিয়ে দিলেন- ফলে, কেউ তাঁকে দেখল না। অথচ তিনি প্রত্যেকের মাথায় মাটি নিক্ষেপ করতে করতে চলে গেলেন। তাঁর চলে যাওয়ার পর কোন এক আগন্তুক অপেক্ষমান যুবকদের জিজ্ঞাসা করল, তোমরা এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? তারা বলল, মুহাম্মদ (সা.)-এর অপেক্ষায়। তাদের এ কথা শুনে আগন্তুক বলল, তিনি তো এখান থেকে বের হয়ে চলেও গেছেন। তিনি তোমাদের প্রত্যেকের মাথায় মাটি নিক্ষের করে গেছেন। একথা শুনে তারা নিজেদের মাথায় হাত দিয়ে দেখল যে, বাস্তবিকই মাটি পড়ে আছে। (আল-বেদায়া ওয়ান-নেহায়া, ২য় খন্ড)

হযরত আলী (রা.) রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর বিছানায় শায়িত ছিলেন। অবরোধকারীরা তাঁর পার্শ্ব পরিবর্তন দেখে বুঝে নিল যে, ইনি মুহাম্মদ (সা.) নন। তাই হত্যার পদক্ষেপ নিল না। সকাল পর্যন্ত অবরোধ করার পর তারা ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে গেল। এ রাত এবং এতে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর জন্যে নিজেকে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ফেলা হযরত আলী (রা.)-এর অন্যতম বিশেষ ফযীলত হিসেবে গণ্য। এদিকে কোরায়েশ নেতাদের পরামর্শ সভায় যে তিনটি অভিমত রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ব্যাপারে পেশ করা হয়েছিল, সেগুলো কোরআন পাকের নিম্নোক্ত আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে :

وَإِذۡ يَمۡكُرُ بِكَ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ لِيُثۡبِتُوكَ أَوۡ يَقۡتُلُوكَ أَوۡ يُخۡرِجُوكَۚ وَيَمۡكُرُونَ وَيَمۡكُرُ ٱللَّهُۖ وَٱللَّهُ خَيۡرُ ٱلۡمَٰكِرِينَ (سُورَةُ الأَنفَالِ : ٣٠(

“সেই সময়টি স্মরণীয়, যখন কাফেররা আপনার বিরুদ্ধে কৌশল উদ্ভাবনে ব্যাপৃত ছিল, আপনাকে বন্দী করবে, অথবা হত্যা করবে অথবা, দেশান্তরিত করবে। কিন্তু আল্লাহ্ তা’আলা তাদের সকল কৌশল ব্যর্থ করে দিলেন। তাই শেষ আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ তা’আলাই শ্রেষ্ঠ কৌশল উদ্ভাবনকারী। তাঁর কৌশল সকল কৌশলকে পরাভ‚ত করে দেয়।” (সূরা আল আনফাল : ৩০) এ ঘটনায় যেমনটি দেখা গেছে। (মা’আরেফুল-কোরআন)

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) ছিলেন তখন খুব কম বয়সী। তাঁর বড় বোন হযরত আসমা (রা.) যিনি ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে যোবায়ের (রা.)-এর মাতা, তিনিই সফরের প্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্রের আয়োজন করলেন। দু’তিন দিনের খাদ্য একটি থলের মধ্যে দিয়ে দিলেন। নতাক (এক প্রকারের বস্ত্র, যা মেয়েরা কোমর পর্যন্ত পরিধান করে) ছিঁড়ে তা দ্বারা খাদ্যপাত্রের মুখ বন্ধ করে দিলেন। এ সৌভাগ্যের জন্য হযরত আসমা (রা.)-কে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) কর্তৃক দু’নেতাক তথা দুই পুটলীর অধিকারিণী উপাধিতে ভূষিত করা হয়। হযরত আবু বকর (রা.)-এর সঙ্গে আগেই কথা ছিল। সেমতে উভয়েই প্রথমে জাবালে সওরের গুহায় গিয়ে আত্মগোপন করলেন। আজও এ গুহাটি বিদ্যমান এবং নবী প্রেমিকদের জন্য একটি দর্শনীয় ভক্তি-আবেগের স্থানরূপে সুপরিচিত।

হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুবক পুত্র হযরত আবদুল্লাহ্ (রা.) রাত্রে গুহায় তাদের সাথে থাকতেন এবং খুব ভোরে শহরে চলে যেতেন। তিনি কাফেরদের গতিবিধি ও পরামর্শ সম্পর্কে যেসব খবর সংগ্রহ করতে পারতেন, রাতে এসে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে সে সব জানাতেন।

হযরত আবু বকর (রা.)-এর ক্রীতদাস সারাদিন ছাগলপাল চরিয়ে দুধ নিয়ে রাতে গুহায় এসে হাজির হত। হুযুর (সা.) ও হযরত আবু বকর (রা.) সেসব বকরীর দুধ পান করতেন। তিনদিন পর্যন্ত তাই ছিল তাঁদের অন্যতম খাদ্য। কিন্তু ইবনে হিশাম লিখেছেন যে, প্রতিদিন সন্ধ্যায় হযরত আসমা (রা.) ঘর থেকে খাবার তৈরী করে গুহায় নিয়ে আসতেন।

সওর গিরিগুহায় অবস্থান : রাসূলুল্লাহ্ (সা.) হযরত আবু বকর (রা.)-সহ সওর পাহাড়ের একটি গুহায় যাত্রা-বিরতি করলেন। এদিকে কোরায়েশ যুবকরা সকাল পর্যন্ত তাঁর বাইরে আসার অপেক্ষায় থাকে। অবশেষে তারা জানতে পারে যে, বিছানায় মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিবর্তে হযরত আলী (রা.) শুয়ে আছেন। তখন হানাদার দল ভীষণ পেরেশান হয়ে চতুর্দিকে তাঁর অন্বেষণ বেরিয়ে পড়ে। কাফেররা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে গ্রেফতার করার জন্যে এক’শ উট পুরস্কার ঘোষণা করে। সেমতে অনেক মানুষ রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সন্ধানে হন্যে হয়ে বেরিয়ে পড়ল।

মহানবী [সা]এর হিজরত

কতক অনুসন্ধান বিশারদ রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর পদাংক অনুসরণ করে ঠিক সউর পর্বতমালার সেই গুহার প্রান্তে পৌঁছে গেল। বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, যদি তারা সামান্য নুয়ে তাকাত, তবে পরিষ্কার রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে চোখের সামনেই দেখতে পেত। আর যখন তাদের এই অতি নিকট উপস্থিতি দেখে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) চিন্তান্বিত হলেন, তখন রাসূলে করীম (সা.) বললেন : ‘চিন্তা করো না। আল্লাহ্ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ পবিত্র কোরআনের সূরা তাওবায় আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় হাবীব (সা.)-এর ঐ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ পূর্বক এরশাদ করেন :

إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدۡ نَصَرَهُ ٱللَّهُ إِذۡ أَخۡرَجَهُ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ ثَانِيَ ٱثۡنَيۡنِ إِذۡ هُمَا فِي ٱلۡغَارِ إِذۡ يَقُولُ لِصَٰحِبِهِۦ لَا تَحۡزَنۡ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَنَاۖ فَأَنزَلَ ٱللَّهُ سَكِينَتَهُۥ عَلَيۡهِ وَأَيَّدَهُۥ بِجُنُودٖ لَّمۡ تَرَوۡهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ ٱلسُّفۡلَىٰۗ وَكَلِمَةُ ٱللَّهِ هِيَ ٱلۡعُلۡيَاۗ وَٱللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ (سُورَةُ التَّوۡبَةِ : ٤٠)

“যদি তোমরা তাকে (রাসূলকে) সাহায্য না কর- তবে মনে রেখো, আল্লাহ্ তার সাহায্য করেছিলেন। যখন কাফেররা তাঁকে বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দু’জনের একজন যখন তারা গুহার মধ্যে ছিলেন, তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন, বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ্ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ্ তার প্রতি স্বীয় সান্তনা নাযিল করলেন এবং তার সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন- যা তোমরা দেখনি। বস্তুতঃ আল্লাহ্ কাফেরদের কথা নিচু করে দিলেন আর আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ্ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আত তাওবাহ্ : ৪০)

গুহাসঙ্গী হযরত আবু বকর (রা.) নিজের জন্যে চিন্তিত ছিলেন না; কিন্তু তিনি ভয়গ্রস্থ ছিলেন এ কারণে যে, শত্রূরা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর উপর হামলা করে বসতে পারে। কেননা, তাদের পদাতিক ও অশ্বারোহীদল সকলেই তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর আশ্রয়স্থলও কোন দুর্ভেদ্য দুর্গ ছিল না; একটি অতি সাধারণ গুহা ছিল মাত্র, যে গুহার প্রান্ত পর্যন্ত অনুসন্ধানকারীরা পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা.) দৃঢ়তার পাহাড় হয়ে কেবল নিজেই নিরুদ্বিগ্ন ছিলেন না, বরং সঙ্গী হযরত আবু বকর (রা.)-কে বলছিলেন : “চিন্তা করো না! আল্লাহ্ আমাদের সঙ্গে আছেন।”

এটা উচ্চারণে দুটি মাত্র বাক্য। কিন্তু পরিস্থিতির পূর্ণচিত্র সামনে রেখে চিন্তা করলে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, নিছক বন্তুনিষ্ঠ চিন্তা-ভাবনাকারী থেকে এহেন প্রশান্তি ও স্বস্তি প্রকাশ পাওয়া সম্ভবপর নয়। এর কারণ তাই, যা কোরআন পাক পরবর্তী বাক্যে এরশাদ করেছে, “আল্লাহ্ আপনার অন্তরে সান্তনা নাযিল করেছেন এবং এমন বাহিনী দ্বারা আপনাকে সাহায্য করেছেন, যাদের আপনি দেখেননি।” এই বাহিনী ফেরেশ্তাদেরও হতে পারে এবং সমগ্র বিশ্বের শক্তিও হতে পারে। এর ফলশ্রুতিতে অবশেষে কুফর অবদমিত হয়েছে এবং আল্লাহর বাণী উচ্চে সমাসীন হয়েছে। (তাফসীরে মা’আরেফুল-কোরআন)

নিজ নিজ বাসস্থান ত্যাগ করে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ও হযরত আবু বকর (রা.) উভয়ে এসে উপস্থিত হলেন সওর পাহাড়ের পাদদেশে। অতঃপর নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পাহাড়ে উঠতে লাগলেন, শক্ত পাথর কণার আঘাতে এক সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর পা মোবারক জখমী হতে লাগল। প্রাণপ্রিয় নবীজী (সা.)-এর এ কষ্ট সহ্য করতে না পেরে হযরত আবু বকর (রা.) তাঁকে নিজ কাঁধে তুলে নিলেন। গুহার দ্বারে পৌঁছে আল্লাহর প্রিয় হাবীব (সা.)-কে বাইরে রেখে হযরত আবু বকর (রা.) প্রথমে গুহার ভিতরে প্রবেশ করে তা ভালভাবে পরিষ্কার করলেন। গুহাগাত্রে কিছু ছোট-খাটো গর্ত ছিল যা নিজ চাদরের টুকরো দিয়ে বন্ধ করে দিলেন।

গুহার মধ্যে হযরত আবু বকর (রা.)-এর উরুতে মাথা রেখে মহানবী (সা.) নিদ্রামগ্ন ছিলেন। হযরত আবু বকর (রা.) একটি মাত্র গর্ত যা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন, পায়ের গোড়ালি দিয়ে চেপে রেখেছিলেন সে গর্তের মুখ। ঘটনাচক্রে তাতে বাস করতো এক বিষধর সর্প যা দংশন করে বসল সিদ্দিকে আকবরকে। বিষের প্রতিক্রিয়ায় সমস্ত দেহ নীল হয়ে গেল, তবুও তিনি একটুও নড়লেন না। এই ভয়ে যে, আল্লাহর প্রিয় হাবীব (সা.)-এর নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এক সময় ব্যথার তীব্রতায় তাঁর দু’চোখ পর্যন্ত জ্বালা করতে লাগল, অশ্রু এসে পতিত হল রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কপাল মোবারকে, তিনি জেগে উঠলেন। ঘটনা জানতে পেরে পবিত্র মুখের সামান্য লালা নিয়ে তা হযরত আবু বকর (রা.)-এর পায়ের দংশিত স্থানে লাগিয়ে দিলেন, তাতে করে সব বিষ-ব্যথা মুহূর্তে দূরীভূত হল।

বিষাক্ত সর্প দংশনে জীবন-মরণের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে নবীপ্রেমিক হযরত আবু বকর (রা.) নিজের জীবনকে তুচ্ছ করেও প্রিয় নবীজী (সা.)-এর নিদ্রায় সামান্য ব্যাঘাত না ঘটুক সেটাকেই অনেক বেশী প্রাধান্য দিলেন। প্রিয় নবীজী (সা.)-এর প্রতি হযরত আবু বকর (রা.)-এর সেই অতুলনীয় ভালোবাসা ও ত্যাগের কথাই প্রতিটি দর্শনার্থীকে স্মরণ করিয়ে দেয় সওর পাহাড়ের সেই ঐতিহাসিক গুহা।

সওর গিরিগুহা থেকে মদীনা অভিমুখে যাত্রা : সওর গুহায় অবস্থানের তৃতীয় দিন রবিউল-আউয়াল মাসের সোমবার হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর মুক্ত ক্রীতদাস আমের ইবনে ফুহায়রা (রা.) দু’টি উট নিয়ে উপস্থিত হলেন। এগুলো এ সফরের জন্যেই হযরত আবু বকর (রা.) সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। এগুলোর সাথে মজুরীর বিনিময়ে নিযুক্ত পথপ্রদর্শক হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উরাইকিতও ঘটনাস্থলে পৌঁছেন। নবী করীম (সা.) এক উটে সওয়ার হয়ে গেলেন। হযরত আবু বকর (রা.) অন্য উটে। তিনি খেদমতের জন্যে আমের ইবনে ফুহায়রা (রা.)-কেও নিজের সাথে বসিয়ে নিলেন। (সীরাতে ইবনে হিশাম : ১ম খন্ড )

একদিন একরাত চলার পর দ্বিতীয় দিন দুপুরে যখন প্রচন্ড গরম পড়ছিল, হযরত আবু বকর (রা.) চাইলেন, মহানবী (সা.) কিছুক্ষণ ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করুন। চারদিকে তাকিয়ে একটি প্রস্তরময় ভূমিতে কিছুটা ছায়া দেখতে পেলেন। সওয়ারী থেকে নেমে তিনি মাটি মুছে সেখানে নিজের চাদর বিছিয়ে দিলেন। মহানবী (সা.) তাতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম গ্রহণ করলেন। এ সময় হযরত আবু বকর (রা.) কোথাও কিছু খাদ্য পাওয়া যায় কিনা, অনুসন্ধান করতে বের হলেন।

কাছেই এক রাখাল তার মেষ-ছাগল চরাচ্ছিল। হযরত আবু বকর (রা.) তাকে একটি বকরীর স্তন পরিষ্কার করে দিতে বললেন এবং নিজের হাতও ভালভাবে পরিষ্কার করে বকরীর দুধ দোহালেন। কাপড় দ্বারা পাত্রের মুখ ঢেকে দিলেন, যেন দুধে ময়লা বা ধুলোবালি পড়তে না পারে। হযরত আবু বকর (রা.) অতঃপর দুধ নিয়ে নবী করীম (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হলেন এবং দুধের সাথে সামান্য পানি মিশিয়ে মহানবী (সা.)-এর সামনে পেশ করলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তা পান করে বললেন, আমাদের যাত্রার সময় কি এখনো হয়নি। সূর্য এখন ঢলে পড়েছে। এরপর তাঁরা সেখান থেকে পূনরায় যাত্রা শুরু করলেন। এভাবে ছোট বড় অনেক ঘটনার মধ্যে দিয়ে সুদীর্ঘ পনের দিন চলার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ও হযরত আবু বকর (রা.) মদীনা মুনাওয়ারার সীমান্তে এসে পৌঁছুলেন।

মহানবী (সা.)-এর পবিত্র হিজরত এমনি এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, যার পূর্ণাঙ্গরূপ বর্ণনা করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। কারণ, এই পবিত্র হিজরতের মাধ্যমেই ইসলামের অনুক‚ল অগ্রযাত্রার শুভ সূচনা করা হয়। সমগ্র বিশ্বব্যাপী এক নতুন সভ্যতার উন্মেষ ঘটে, তাই হিজরত প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সীরাত বিশারদ ইমাম ইবনে ইসহাক (রাহ্.) বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর পবিত্র হিজরত সীরাতে রাসূল (সা.)-এর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। সুতরাং হিজরতের

অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন করার মধ্যেই সীরাতে রাসূল (সা.)-এর পূর্ণাঙ্গ চিত্র হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব।’ (সীরাতে ইবনে ইসহাক : ১ম খন্ড, হিজরতের ভুমিকা অধ্যায়)

সুরাকা ইবনে মালেকের পথিমধ্যে পৌঁছানো : কোরায়েশদের প্রেরিত অনুসন্ধানকারীদের একজন সুরাকা ইবনে মালেক রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর খোঁজে হন্যে হয়ে ফিরছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যাত্রার পর কিছুদূর অগ্রসর হলে, সে সেখানে পৌঁছে গেল। নিকটে পৌঁছার পর তার ঘোড়া হোঁচট খেল এবং সুরাকা মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু পূণঃরায় ঘোড়ায় চড়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর পেছনে চলতে লাগলো। সে কোরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পেল। তখন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বার-বার পেছনে ফিরে সুরাকাকে দেখছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তার প্রতি ভ্রƒক্ষেপও করলেন না। যখন সুরাকা আরও নিকটবর্তী হল, তখন তার ঘোড়ার পদ চতুষ্টয় শুষ্ক ও কঠিন হওয়া সত্তে¡ও মাটিতে হাঁটু পর্যন্ত দেবে গেল। অতঃপর শত চেষ্টা করেও সে ঘোড়াকে উদ্ধার করতে সক্ষম হল না। অবশেষে বাধ্য হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর আশ্রয় প্রার্থনা করল। তিনি থেমে গেলেন এবং তাঁর বরকতে ঘোড়া সেখান থেকে বের হয়ে এল। (সীরাতে ইবনে-হিশাম, ১ম খÐ)

সুরাকা ইবনে মালেকের ঘোড়ার পা মাটি থেকে বের হলে পায়ের জায়গা থেকে ধোঁয়া উত্থিত হতে দেখা গেল। ধোঁয়া দেখে সুরাকা আরও বেশি হতভম্ব হয়ে গেল। সে নেহায়েত কাকুতি-মিনতি সহকারে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সামনে পাথেয়, উপস্থিত আসবাবপত্র, উট ইত্যাদি পেশ করতে লাগল। তিনি তা কবুল করলেন না এবং বললেন : তুমি যখন ইসলাম কবুল করছো না, তখন এতটুকুই যথেষ্ট যে, তুমি আমাদের অবস্থান সম্পর্কে কাউকে বলবে না। সুরাকা সেখান থেকে ফিরে এল এবং নিরাপদ দূরত্বে না পৌঁছা পর্যন্ত এ ঘটনা কারও কাছে প্রকাশ করল না। (সীরাতে-হালাবিয়া : ১ম খন্ড)

মহানবী [সা]এর হিজরত

সুরাকার মুখে নবুওয়াতের স্বীকারোক্তি : এই ঘটনার কিছুদিন পর সুরাকা আবু জাহ্লের কাছে এই ঘটনা উল্লেখ করার পর কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করল, যার অনুবাদ এরূপ : ‘হে আবুল হাকাম (আবু জাহল), লাতের কসম, (লাত একটি মূর্তি, কোরায়েশরা তার পূজা করত) যদি তুমি ঘোড়ার মাটিতে দেবে যাওয়া প্রত্যক্ষ করতে, তবে মুহাম্মদ (সা.) যে আল্লাহর রাসূল, সে বিষয়ে তোমার কোন সন্দেহ থাকত না। আমার মতে তাঁর বিরুদ্ধাচারণ থেকে নিজেরাও বেঁচে থাকা এবং অন্যকেও বিরত রাখা তোমার জন্যে অপরিহার্য। কেননা, আমার বিশ্বাস কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর সাফল্যের চিহ্ন এমনভাবে চমকে উঠবে যে, সকল মানুষ বাসনা করবে, হায়! আমরা যদি তাঁর সাথে সন্ধি করে নিতাম!

উম্মে মাবাদ তাঁর স্বামীর ইসলাম গ্রহণ : পথিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) উম্মে মা’বাদ (বিনতে খালেদ) নামে এক মহিলার তাবুর কাছ দিয়ে গমন করলেন। তার ছাগল একেবারেই দুধ দিত না। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ছাগলের স্তনে হাত বুলাতেই তা দুধে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। নবী করীম (সা.) সঙ্গীগণসহ সেই দুধ পান করলেন। এরপর দুধের এই বরকত বন্ধ না হয়ে পরেও অব্যাহত থাকে। তিনি যখন সেখান থেকে বিদায় হন, তখন উম্মে মা’বাদের স্বামী গৃহে এসে ছাগলের দুধ সম্পর্কিত এই বিস্ময়কর ঘটনা দেখতে পায়। সে হতবুদ্ধি হয়ে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে পর উম্মে মা’বাদ বলল : একজন অত্যন্ত ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত যুবক আজ আমাদের গৃহে কিছুক্ষণের জন্যে মেহমান হয়েছিলেন। এগুলো সব তাঁর হাতের বরকত। স্ত্রীর মুখে এ কথা শুনে স্বামী বলল : হে উম্মে মা’বাদ! আল্লাহর কসম, এই আগন্তুকই সেই প্রতিশ্রুত মহাপুরুষ- যাঁর আগমনের মুহূর্তটির জন্যে সমগ্র বিশ্ব উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষায় ছিল। যিনি সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যে ত্রাণকর্তারূপে প্রেরিত হয়েছেন। স্বামীর মুখে এ কথা শুনে হযরত উম্মে মা’বাদ (রা.) বললেন : তুমি সত্যিই বলেছো! কেননা, তিনি যখন দূর থেকে আমাদের তাবুর দিকে এগিয়ে আসছিলেন তখন তাঁকে দেখে আমার মনে হচ্ছিল, তপ্ত মরুভ‚মিতে একখন্ড শীতল মেঘ যেন এগিয়ে আসছে। তাঁর পবিত্র চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও উজ্জল ও সুন্দর ছিল। তিনি এগিয়ে আসার পর যখন আমাদের তাবুর সামনে দাঁড়ালেন তখন মনে হচ্ছিল যে, চারপাশ যেন এক স্বর্গীয় আলোয় আলোকিত হয়ে গেল।

উম্মে মা’বাদ (রা.) কর্তৃক নবী করীম (সা.)-এর অবয়ব সম্পর্কে রচিত সেই বিখ্যাত কবিতার দুটি চরণ ছিল নিম্নরূপ :

جَزَى اللَّهُ رَبُّ النَّاسِ خَيْرَ جَزَائِهِ * رَفِيقَيْنِ حَلَّا خَيْمَتَيْ أُمِّ مَعْبَدِ

هُمَا نَزَلَاهَا بِالْهُدَى وَاهْتَدَتْ بِهِ * فَقَدْ فَازَ مَنْ أَمْسَى رَفِيقَ مُحَمَّدِ

(اَلْمُسْتَدْرَك عَلَى الصَّحِيْحَيْنِ فِيْ كِتَابُ الْهِجْرَةِ : ٤٢٧٤)

এক রেওয়ায়াতে আছে, এরপর তাঁরা স্বামী-স্ত্রী উভয়েই হিজরত করে মদীনায় পৌঁছে যায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হয়। (মুসতাদরাক হাকেম : ৪২৭৪, সীরাতে ইবনে-হিশাম : ১ম খন্ড) (হিজরতকালীন মহানবী (সা.) সর্বমোট আটটি স্থানে যাত্রা-বিরতি বা বিশ্রাম গ্রহণ করেন- যা আজও তাঁর পবিত্র স্মৃতি-বিজড়িত হিজরতের মনযিল হিসেবে পরিচিত। এই সুদীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় বহু চিত্তাকর্ষক মু’জিযা বা অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এ যাবৎ কালের সর্ববৃহৎ সীরাতগ্রন্থ হিসেবে পরিচিত ও আরবী ভাষায় রচিত ‘সীরাত বিশ্বকোষ’ নামক তিন শতাধিক খন্ডের বৃহৎ সীরাত গ্রন্থে মহানবী (সা.)-এর মক্কা থেকে মদীনায় পবিত্র হিজরত সম্পর্কিত সে সকল হৃদয়গ্রাহী ঘটনাবলী ধারাবাহিকভাবে দুই শতাধিক পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যা আমরা পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করব ইনশাআল্লাহ্।)