হাজার রাতের চেয়েও উত্তম যেই রাত্রি | লাইলাতুল কদর | Modern Islam

609

হাজার রাতের চেয়েও উত্তম যেই রাত্রি

আজ আপনি সেই মহিমান্বিত শ্রেষ্ঠতম রাতের দ্বারপ্রান্তে। যে রাত আপনার জীবনে পাওয়া সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম রাত।

আপনার জীবনের সর্বশেষ গন্তব্যস্থান খুঁজে নেয়ার রাত্।

আপনার জীবনের সকল পাপ ও ভুলভ্রান্তিকে ক্ষমা মাধ্যমে মুছে ফেলার রাত।

এটি এমন এক রাত যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এমন এক রাত, যে রাতের ইবাদত

জীবনভর ইবাদাত করার চেয়েও অনেক বেশি উত্তম।

“আমি কুরআন নাজিল করেছি কদরের রাতে।তুমি কি জানো,কদরের রাত কি?কদরের রাত হাজার মাসের চাইতেও বেশি ভাল ।

ফেরেশতা ও রুহ এই রাতে তাঁদের রবের অনুমতিক্রমে প্রত্যেকটি হুকুম নিয়ে নাজিল হয়।এ রাত্টি পুরপুরি শান্তিময় ফজরের উদয় পর্যন্ত”।

আমাদের প্রত্যেকের গড় আয়ু ষাট থেকে সত্তর বছর। তারমাঝে শৈশবে কেটে যায় দশ-পনের বছর। কর্মজীবনে পার করে দেই দশ বছর।

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আরো দশ বছর কেটে যায়। বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করতে গিয়ে আরো পাঁচ বছর শেষ হয়ে যায়।

কিছু সামাজিকতা ও বিনোদনের মাধ্যমে কাটিয়ে দেই আরও দশ বার বছর।

এরপর দশ-পনের বছরের বাকি যে সময়টুকু আমাদের কাছে  থাকে তার কতটুকু সময় আমরা পুরোপুরি ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে কাটিয়ে দিতে পারি।

অথচ লাইলাতুল কদর এমন একটি ফজিলতপূর্ণ রাত যা  হাজার মাস অর্থাৎ ৮৩ বছরের চাইতেও  উত্তম।

এর মানে হচ্ছে লাইলাতুল কদরের একটি রাত যদি আমরা পরিপূর্ণ আন্তরিকতার সাথে

ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে কাটিয়ে দিতে পারি তবে এর মূল্য হবে সারা জীবন প্রতিটি মুহূর্তে

প্রতিটি ক্ষণে আল্লাহ সুবহানা তাআলা কথা স্মরণ করে ও তাঁর প্রতি এবাদত বন্দেগী করে

কাটিয়ে দেয়ার চেয়েও উত্তম হবে। এর  চাইতেও মর্যাদাপূর্ণ।

লাইলাতুল কাদর আমাদের জন্য এমন এক পুরস্কার যা  পেলে মনে হয় আল্লাহ সুবহানা

তাআলা আসলে  আমাদেরকে জান্নাত দান করার জন্য অজুহাত খুঁজছেন, বিভিন্ন উপায় খুজছেন।

আমাদের প্রত্যেকের আল্লাহ সুবহানা তাআলার গুনাগার বান্দা।

কেউ নামাজ ঠিক মতো পড়িনা, তো কেউ আবার মিথ্যা কথা বলি। কেউ কেউ বাবা মায়ের সাথে খারাপ আচরণ করি।

কিছু মানুষ জিনায় লিপ্ত, কেউ মদ্য পান করি । অনেকেই মাদকাসক্ত। কেউ কেউ সুদ, ঘুষ ও নানারকম পাপাচারে লিপ্ত।

এরকম নানাবিদ ভুল-ভ্রান্তিতে মধ্যে আমরা ডুবে আছি।   

লাইলাতুল কাদর

অথচ আল্লাহ সুবহানা তাআলা তার অশেষ রহমতের কারণে লাইলাতুল কদর এর মত

মহিমান্বিত রাতের দরজা আমাদের কারো জন্য তা বন্ধ করে দেননি।

বরং আল্লাহ সুবহানা তাআলা এই রাতটিকে যেন খাস ভাবে আমাদের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। আমাদের প্রতি আল্লাহ সুবহানা তাআলার যে রহমত ও ভালোবাসা তা সত্যিই আমাদের কল্পনাশক্তিকেউ হার মানায়।

জেনে আমরা জেনে নেই সেই মহিমান্বিত রজনি লাইলাতুল কদর কবে।

রাসূল সাঃ বলেছেন, লাইলাতুল কদরকে রমাজানের শেষ দশ রাত্রিতে খুঁজো।

তবে এটা সত্যি যে, অন্যান্য হাদিসে বলা হয়েছে, রমজানের শেষ দশদিনের বিজোড়

রাত্গুলো যেমন, ২১ এর রাত, ২৩ এর রাত, ২৫ এর রাত, ২৭ এর রাত ও ২৯ এর রাতের

কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

নিঃসন্দেহে পুরোপুরি নিশ্চিত ভাবে লাইলাতুল কদর পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো রামজানের শেষ ১০ রাতের প্রতিটি রাতেই একাগ্রতার সাথে এবাদত করা।

মনে করুন একটি লটারি হচ্ছে। আপনাকে বলা হল ১ থেকে ১০ নম্বর টিকিটের যেকোনো একটিতে অবশ্যই পুরস্কার জিতবে।

তখন আপনি কি কোন টিকিট কেনা বাদ রাখবেন?

অবশ্যই না।

লাইলাতুল কাদর

টিকিটের দাম যতই হোক না কেন বড় পুরস্কারের কথা চিন্তা করে আপনি দশটি টিকিটই

কিন্তু কিনে ফেলবেন কেননা লটারি জেতার পুরস্কার টিকিটের দামের থেকে  লক্ষ্য গুনে বেশি।  

অতএব আমাদেরও উচিত রমজানের শেষ ১০টি রাতের প্রতিটি রাতে নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে প্রচেষ্টা  করা। 

সেই সাথে হয়তো যেই রাতগুলো কথা বিশেষভাবে হাদিসে বলা হয়েছে যেমন সাতাইশের রাত

এবং বিজোড় রাত্গুলো আমরা বাড়তি বেশ কিছু আমল করতে পারি।

বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে ২৭ রমজানের পরের রাত্গুলোতে যখন খতমে তারাবী

শেষ হয়ে যায় সেই সময় যেন কোনোভাবেই আমাদের এবাদত কমিয়ে না দিই।

আসুন এবার জেনে নেই লাইলাতুল কদরে আমাদের করণীয় গুলো কি?

আয়শা রাদিয়াল্লাহ তালা আনহা  বলেন, “রমাজানের শেষ দশ রাত্রিতে রাসূল সাঃ তার কোমর বেঁধে ইবাদত-বন্দেগীতে নেমে পড়তেন।

অর্থাৎ অন্যান্য সময় যতটা এবাদত করতেন রমজানের শেষ দশটি রাতে তিনি সেই এবাদত এর পরিমাণ অনেক গুণ বাড়িয়ে দিতেন”।

রাসূল সাঃ এর উম্মত হিসেবে আমাদের উচিত হবে ঠিক উনি যেভাবে ইবাদত বাড়িয়ে

দিতেন আমরাও যেই  অবস্থায় আছি আমাদের ব্যক্তিগত ইবাদতগুলো রমজানের শেষ

দশটি  রাত্রিতে বাড়িয়ে দেওয়া।

লাইলাতুল কাদর

এখানে সবার হয়তবা একই ফর্মুলা কাজ নাও হতে পারে।

যেমন ধরুন  যার ফরজ নামাজ পড়ার অভ্যাস নেই তার অবশ্যই প্রথম লক্ষ্যটি হবে

রমজানের দশটি রাতে কোনভাবেই ফরজ নামাজ যেন বাদ না পড়ে।

অন্যদিকে আল্লাহ সুবহানা তাআলা রহমতে যারা ফরজ

এবং সুন্নত নিয়মিত পড়ে থাকেন তাদের উচিত হবে  বেশি বেশি করে নফল ইবাদত করা।

লাইলাতুল কদরের রাতকে সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগানোর জন্য একটি চমৎকার সুযোগ

হচ্ছে এশা ও ফজরের নামাজ মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করা নেয়া।

কেননা রাসূল সাঃ বলেছেন, “যে ব্যক্তি জামাতের সাথে এশা ও  ফজরের নামাজ আদায় করবে সে যেন সারারাত নামাজ পড়ল”।

অর্থাৎ আপনি যদি এশা ও ফজরের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করলে আপনি পুরো রাতের নামাজ পড়ার সওয়াব পেয়ে যাবেন।

এরপর আপনি বাড়তি যে আমল করবেন সেটা আপনার জন্য  বোনাস।

অতএব আমাদের সকলের লক্ষ্য থাকা উচিত আর কোন ইবাদাত হোক আর না হোক

রমাজানের শেষ ১০টি রাতে যেন অবশ্যই আমরা এশা এবং ফজরের নামাজ মসজিদে

গিয়ে জামাতের সাথে আদায় করে নিতে পারি।

অন্যদিকে তারাবির নামাজ ইমামের পেছনে পুরোটা শেষ করলে অর্থাৎ ইমাম যত রাকাত

নামাজই পড়ুক না কেন আপনি তার পেছনে দাঁড়িয়ে পুরো নামাজ শেষ করলেও পুরো রাতের নামাজ পড়ার সওয়াব পাওয়া যাবে আলহাদুলিল্লাহ।

লাইলাতুল কাদর

ইবাদতের ক্ষেত্রে রাসুল সাঃ এর  সৌন্দর্য ও আন্তরিকতার দিকে মনোযোগ ছিল। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

নামাজের তিনি লম্বা লম্বা সূরা তিলাওয়াত করতেন এবং দীর্ঘসময় নিয়ে রুকু এবং সেজদাতে দোয়া করতেন।

রাসূল সাঃ নামাযে দাড়িয়ে সূরা পড়ার সময় জাহান্নামের আয়াত আসলে তিনি তেলাওয়াত

থামিয়ে আল্লাহ সুবহানা তাআলার কাছে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি চাইতেন।

আর জান্নাতের আয়াত আসলে আল্লাহ সুবহানা তাআলার কাছে জান্নাত লাভের জন্য দো’আ করতেন।

রাসূল সাঃ ইবাদতের প্রতিটি উচ্চারণেই ছিল আল্লাহ সুবহানা তাআলার সাথে আন্তরিকতা প্রকাশ।

আল্লাহ সুবহানা তাআলার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা।

এখন আমরা অনেকেই বলতে পারি, আমাদের তো বড় বড় সূরাগুলো মুখস্ত নেই আর যেগুলো মুখস্ত আছে সেগুলোর অর্থ তো বুঝি না ।

এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

তবে আমাদের সকলের উচিত যেসব সূরা আমাদের মুখস্ত আছে এখন থেকে সেগুলোর শাব্দিক অর্থ নিয়ে পড়াশোনা করা।

এবং নতুন নতুন সূরা মুখস্থ করা।

কিন্তু এখন যেহেতু সেই মহিমান্বিত দশটি রাত  চলেই এসেছে আমাদের উচিৎ হবে রুকু 

এবং সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করার মাধ্যমে আমাদের নামাজকে সুন্দর করে তোলা।

বিশেষ করে সেজদায় বান্দা আল্লাহ সুবহানা তাআলার সবচেয়ে নিকটে থাকে।  

তাই এই সময় আমাদের উচিত মন খুলে আল্লাহ সুবহানা তাআলার নিকট বেশি বেশি দোয়া করা।

আপনার দুনিয়া এবং আখেরাতে যা কিছু প্রয়োজন সুবহানা রাব্বিয়াল আলা তিনবার বলার পর আল্লাহ সুবহানা তাআলার কাছে চাইতে থাকুন।

আপনি মন খুলে আল্লাহ সুবহানা তাআলার কাছে চাইতে পারছেন না, আপনার অন্তর পাথর হয়ে হয়ে আছে।  তাতে কোনো অসুবিধা নেই।  

আল্লাহ সুবহানা তাআলা কে আপনার এই দোয়া না করতে পারার কথাটাই বলুন।

তিনি আপনার অন্তরকে প্রশস্ত করে দিবেন। সেই সাথে তিনি আপনার জিব্বা খুলে দেবেন।

আপনি কখনো কি  ৫ মিনিট, ১০ মিনিট, ১৫ মিনিট ধরে একটা সেজদা করেছেন?

যদি না করে থাকেন তাহলে রমজানের শেষ ১০ রাতেই তা চেষ্টা করে দেখুন।

কেননা এমন চমৎকার সুযোগ কি আর কখন হতে পারে?

বরকতময় শেষ দশটি রাতে আমরা নামাজের পাশাপাশি অন্যান্য ইবাদত পালনের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দিতে পারি।

আয়েশা রাদিয়ালাহু তালা আনহা যখন  রাসূল সাঃ কে  জিজ্ঞেস করলেন,  

লাইলাতুল কাদর

“আমরা যদি লাইলাতুল কদর পেয়ে যাই তখন আমরা কি দুআ করব?”  

রাসুল সাঃ বললেন, তোমরা বলবে আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি। “হে আল্লাহ  আপনি ক্ষমাশীল। ক্ষমাকে ভালোবাসেন। তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন”। সুবহানাল্লাহ কত সুন্দর সমাধান।

আল্লাহ সুবহানা তাআলা রাসূল সাঃ দশটি জিনিস চাইতে বলেনি । ১০০ রাকাত নামাজও পড়তে বলেননি ।  

আসলেই আমাদের সকল ইবাদতের মূল লক্ষ্যটা কি?

আল্লাহ সুবহানা তাআলার নিকট ক্ষমা লাভ করা।

একটিবার আল্লাহ সুবহানা তাআলার ক্ষমা পেয়ে গেলে দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্য আমাদের আর কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই।

তাই রাসুল সাঃ আমাদের ঐ দোআ টাই মহিমান্মিত সেই রাতটিতে বেশি বেশি করে পরতে বলেছেন।

উক্ত সময়ে  যেই বোনদের নামাজ থাকবে না তারাও অন্যসব জিকির-আজকারের সাথে

সাথে আল্লাহ সুবহানা তাআলা নিকট দুহাত তুলে এই দোয়াটি বেশি বেশি করার মাধ্যমে

লাইলাতুল কদরের পুরো ফজিলত টাই আদায় করে নিতে পারবেন।

শ্রেষ্ঠতম এই মাসের শেষ ১০ রাত্ হলো আপনার ব্যক্তিগত ক্যানভাস অর্থাৎ আমলের সবচেয়ে বড় সুযোগ।

নামাজ,কোরআন তেলাওয়াত,দুআ,জিকির-আজগার ও সদকা এসব  ইবাদতগুলো হল আপনার মনের রঙ।

আপনার মনের মতো রং দিয়ে রাঙিয়ে দিন হাজার মাসের চেয়েও উত্তম এই রাতটিকে।

আপনি যদি সারারাত শুধুমাত্র নামাজ পড়ার মধ্য দিয়ে  কাটিয়ে দিতে চান তাতেও আপনার কোন বাধা নেই। 

লাইলাতুল কাদর

আপনি একটু একটু করে যদি বিভিন্ন এবাদতের মাধ্যমে সারা রাত কাটিয়ে দেন তাতেও কোনো সমস্যা নেই।  

এই মহিমান্বিত রাতে পুরো মহাবিশ্বে কানায় কানায় ফেরেস্তা দিয়ে ভরে যায়।

তারা সকলেই তাদের রবের এবাদত করতে থাকে। তাদের রবের গুন গান করতে থাকেন।

আসুন মহিমান্বিত এই ১০টি রাতে তাদের সাথে আমরা আমাদের রবেরএবাদতে যোগ দেই।

তাহলেই অনন্ত কাল এর প্রতিদান উপভোগ করতে পারব।

আল্লাহ সুবহানা তাআলা আমাদের সবাইকে লাইলাতুল কদরে সারা রাত আপনার ইবাদত বন্দেগীতে কাটিয়ে দেবার তৌফিক দান করুণ। আমিন।