মাগফিরাতের মাস রামাদান| Ramadan 2020 | Modernislam

960
31 Shares

আজকে আমরা আসন্ন রামাদান উপলক্ষে বিশেষ একটি আলোচনা করতে যাচ্ছি । রমজান আসছে বলে আমরা সবাই এটা নিয়ে বেশ আনন্দিত এবং উৎফুল্ল।

আলহামদুলিল্লাহ আমি আল্লাহ সুবহানা তাআলার কাছে শুকরিয়া আদায় করি তিনি আমাদেরকে আবার এই মহিমান্বিত মাসটি দেখার সৌভাগ্য দান করেছেন এবং এই পবিত্র মাস শুরুর আগেই বা মাস চলাকালীন আল্লাহ সুবহানা তাআলা যেন আমাদের সকল ইবাদত ও দোয়া কবুল করে নেন আমীন।

এবং আরো দোয়া করি যেন আমাদেরকে ও পরিবারের সবাইকে যেন এই বছরের পবিত্র রজনী লাইলাতুল কদরটা পেয়ে যাই ইনশাআল্লাহ।

আমি এই পর্বে আপনাদের সাথে পবিত্র কোরআনে কিভাবে রামাদান সম্পর্কে বলা হয়েছে তা আলোচনা করব। আমাদের সকলকে কিছু বিষয় সম্পর্কে জানা দরকার।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সুবহানা তাআলা রামাদান সম্পর্কে শুধুমাত্র একবার বলেছেন। কিন্তু আল্লাহ সুবহানা তাআলা তাকওয়ার ব্যাপারে, আখিরাতের ব্যাপারে অনেকবার বলেছেন।

বিভিন্ন নবীদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে অনেকবার বলেছেন।  আল্লাহ সুবহানা তাআলা তার বিভিন্ন বিধি-বিধান সম্পর্কেও অনেকবার বলেছেন।

কিন্তু যখন রামাদানের কথা আসছে মাত্র এক জায়গায় বলা হয়েছে এর আর কোন পুনরাবৃত্তি হয়নি বা কোন জায়গায় বলাও হয়নি।

শুধু বলা হয়েছে সুরা বাকারাতে। তবে বাকারার  কোন আয়াতে এটি বলা হয়েছে সেটি আমাদের জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আপনারা সবাই জানেন সুরা বাকারার প্রথম অংশে আল্লাহ সুবহানা তাআলা সেই কারণগুলো সম্পর্কে বলেছেন যে কারণে বনী-ইসরাঈলরা আল্লাহ সুবহানা তাআলার অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।

আল্লাহ্‌ সুবহানা তাআলা তাদের ভুলগুলো সম্পূর্ণ একটি তালিকা সূরা বাকারায় দিয়েছেন। সেই তালিকার শেষে গিয়ে আল্লাহ্‌ সুবহানা তাআলা ইব্রাহিম আলাই সালাম সম্পর্কে বলেছেন।

আল্লাহ্‌ সুবহানা তাআলা ইব্রাহিম (আঃ) সম্পর্কে কেন বলেছেন?  কারণ আরব এবং ইয়াহুদীদের মাঝে যোগসুত্রকারী হলেন ইব্রাহিম (আঃ)। কেন তিনি এই  দুটোর মাঝখানে যোগসুত্রকারী হলেন?

কারণ আরবেরা ইসমাঈল (আঃ) এর সন্তান আর ইহুদীরা হচ্ছে ইসহাক (আঃ) এর  সন্তান। তাদের মধ্যে একমাত্র যোগসূত্র হচ্ছে তাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন ইব্রাহিম (আঃ)।

তাদেরকে ইব্রাহিম (আঃ ) এর কথা মনে করিয়ে দেওয়া কারণ হচ্ছে, তারা বলেছে যার পূর্বপুরুষ তাদেরও  পূর্বপুরুষ তারা শুধু এমন কোন নবীকে মেনে নিবে ।

এবং তাঁরা তাদের পূর্বপুরুষ বলতে বুঝাচ্ছে শুধুমাত্র ইসহাক (আঃ) কে । আর  আল্লাহ সুবহানা তাআলা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, তোমরা কেন এত পক্ষপাত দেখাচ্ছ ইসহাক (আঃ) এর সন্তানদের প্রতি?

আর ইব্রাহিম (আঃ) এর সন্তানদের কেন তোমরা গুরুত্ব দিচ্ছ না?

কারণ ইব্রাহিম আঃ হচ্ছে ইসমাইল আঃ এর বাবা।  আর সেই বংশ ধরে এসেছেন হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)।

অর্থাৎ  মূল বিষয়টি হচ্ছে ইব্রাহিম আঃ এর  সন্তানেরা আল্লাহ সুবহানা তাআলার নির্বাচিত উম্মাহ । এবং সেই সূত্র অনুসারে প্রথমত তারা ছিল ইছহাক আঃ এর সন্তান আর তারপরে তারা হল ইসমাইল আঃ এর  সন্তান ।

কিন্তু দিন শেষে তারা সবাই কে? তাঁরা সবাই ইব্রাহিম আঃ  এর সন্তান অর্থাৎ ওখানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। 

এটা আসলে  কোন পরিবর্তনই না। তাই কেন তাদেরকে আর রিসালাত দেওয়া  হবে না? সেই কারণ গুলো বলার পর তাদের কাছে  ইব্রাহিম আঃ সম্পর্কে  উল্লেখ করা হচ্ছে। উনার সম্পর্কে যে ঘটনাটি বলা হচ্ছে তা হলো।

কাবা ঘরের ভিত্তি  স্থাপন করলেন তিনি। সুরা বাকারার প্রথম ভাগের শেষের দিকে এই  সম্পর্কে একটু আভাস দিচ্ছেন। এটি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন ?

রামাদান,Ramadan 2020,Modernislam,Modern Islam

আল্লাহ্‌ সুবহানা তাআলা এখানে একটু আভাস দিচ্ছেন কাবা সম্পর্কে । কাবা তৈরির ইতিহাস হলো। কাবা ঘরের ভিত্তিস্থাপন করলেন ইব্রাহিম আঃ।

এর কয়েক আয়াত  পরেই আল্লাহ্‌ সুবহানা তাআলা মুসলিমদের আর মসজিদুল আকসার দিকে ফিরে নামাজ না পড়ার জন্য আদেশ দিচ্ছেন। তাদের মসজিদুল-হারামের দিকে ফিরে নামাজ পড়তে হবে ।

কিন্তু কাবা ঘরের দিকে ফিরে নামাজ পড়তে হবে একথা বলার আগে তিনি বলেছেন ইব্রাহিম আঃ  হচ্ছে সেই ব্যক্তি যিনি এটা বানিয়েছিলেন ।

কারণ ইয়াহুদী এবং মুসলিমরা ততদিন পর্যন্ত  আল-আকসা দিকে ফিরে নামাজ পড়ত। এই আয়াত আসার আগ পর্যন্ত ইয়াহুদিরা যেদিকে ফিরে প্রার্থনা করত  মুসলমানেরও সেই একই দিকে ফিরে নামাজ পড়ত। এই আয়াত আসার পরেই  মুসলিমদেরকে কাবার দিকে ফিরে নামাজ পড়ার  আদেশ দেয়া হয়েছে।

এখন আপনারা এটাও জানেন যে রাসূলুল্লাহ (সাঃ ) মক্কায় থাকা কালীন সময়ে তিনি একইসাথে কাবা এবং মসজিদউল আকসার দিকে ফিরে নামাজ পড়া যেত।

কাবার এমন পাশে দাঁড়াত  যাতে কাবা এবং আকসা দুটোই তাদের সামনে থাকে। মক্কাতে এটা সম্ভব ছিল কিন্তু মদিনাতে যাওয়ার পর আর সেই আর সেই সুযোগটা থাকল না । কাবার দিকে ফিরতে হবে আর অথবা কাবার দিকে পিঠ দিয়ে আকসার দিকে ফিরে নামাজ পড়তে হবে তাদের পক্ষে আর একসাথে দুই দিকে মুখ করা সম্ভব নয়।  

এটা নবী সাঃ উনার  জন্য বেশ বেদনা দায়ক ছিল। এই বিষয়টা আল্লাহ্‌ সুবহানা তাআলা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন । কোরআনে যখন কিবলা পরিবর্তনের আয়াতটা  আসলো।

“নিশ্চয়ই আমি আকাশের দিকে তোমার মুখমণ্ডল উত্তোলন অবলোকন করেছি তাই আমি তোমাকে ওই কিবলামুখী করাচ্ছি যা তুমি কামনা করছ”।

রামাদান

উদাহরণ হিসাবে বলতে পারি, একটা জাতির পরিচয় তার দেশের রাজধানীর পরিচয়ে পরিচিত হয়। আপনি যখন একটি জাতিতে পরিণত হবেন ঠিক তখন আপনার একটি রাজধানী থাকতে হবে। রাজধানী একটি জাতির পরিচয় বহন করে।

ঠিক তেমনি মুসলিম হিসাবে কিবলা আমাদের পরিচয় বহন করে। সুতরাং মক্কা হচ্ছে আমাদের ইসলামিক রাজধানী । আমরা ওই দিকে মুখ করে ইবাদাত করি ।  যখন আল্লাহ সুবহানা তাআলা এই দিক পরিবর্তন করে দিচ্ছেন তখন তিনি আসলে আমাদের বাহ্যিক পরিচয় এর জিনিসটা পরিবর্তন করে দিচ্ছেন।  

উনি আমাদের পরিচয় পরিবর্তন করে দিচ্ছেন।  এখানে মজার ব্যাপার হলো আল্লাহ সুবহানা তাআলা ইয়াহুদী এবং মুসলিমদেরকে দুই জাতিতে আলাদা করতে চাইলেন । তাই তিনি রাজধানী পরিবর্তন করে দিলেন। যখনই আল্লাহ্‌  আমাদের রাজধানী পরিবর্তন করলেন তিনি বললেন । “আমি এইভাবে তোমাদেরকে মধ্যম জাতিতে পরিণত করলাম”  

আল্লাহ্‌ সুবহানা তাআলা আমাদেরকে একটি নতুন জাতিতে পরিচিত করালেন কারণ এখন আমাদের একটি নিজস্ব রাজধানী আছে। আল্লাহ সুবহানা তাআলা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন যে, ইহুদীরা কিবলা পরিবর্তনের বিষয়টি পছন্দ করেন নি। ইহুদীরা পছন্দ করেনি প্রশ্ন কেন আসে?

কারণ আপনি কোন দিকে মুখ করে নামাজ পড়লেন তাতে কি ইহুদী খ্রীষ্টান হিন্দু বা বৌদ্ধদের কিছু এসে যায়। এটা তাদের জন্য কোন চিন্তার বিষয় নয়। মুসলিমরা কিবলার দিকে মুখ ফিরে   নামাজ পড়ুক বা  অন্যদিকে ফিরে নামাজ পড়ুক তাতে তাদের কি আসে যায়। কিন্তু আল্লাহ বলছেন ।

“ তাদের  মাঝে বোকা লোকেরা বলবে কেন তাঁরা তাদের মুখ ফিরিয়ে নিল কি জন্য তারা যেটাকে একসময় কেবলা মনে করত তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, কেন তারা দিক পরিবর্তন করল? ।

অন্যভাবে বলা যায় মদিনার ইহুদীরা অপমান বোধ করেছিল। তারা অপমান বোধ করল কেন? কারণ তারা ভিতরে ভিতরে ঠিক বুঝতে পেরেছিল যতক্ষণ তাঁরা আকসার দিকে মুখ ফিরবে ততক্ষণ পর্যন্ত ওটাই রাজধানী থাকবে এবং তারাও আল্লাহর  নির্বাচিত লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।

কিন্তু যখনই দিক পরিবর্তন হচ্ছে তখন তারা বুঝতে পারল আগে যেটা আমাদের রাজধানী ছিল সেটা রাজধানী হিসেবে স্বীকৃত নয়। আমাদেরকে নতুন রাজধানী গ্রহণ করতে হবে যার মানে হচ্ছে আমাদেরকে এখন ইব্রাহিম (আঃ ) এর অন্য  সন্তান ইসমাইল  (আঃ) এর বংশধরদের কেউ স্বীকার করে নিতে হবে। আমরা আর আমাদের নিজস্ব পরিচয় ধরে রাখতে পারব না ।

রামাদান

আল্লাহ সুবহানা তাআলার দৃষ্টিতে আমাদের আর উঁচু স্থান নেই। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে,  তারাও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু সালামকে রসূল বলে বিশ্বাস করত। তারা সকলে জানত যে, মুহাম্মাদ সাঃ  আল্লাহর রাসূল ।

এবং তারা অপমানিত বোধ করছিল। আর এভাবে অপমানিত হয়েই তাঁরা প্রমান করল যে, মনে মনে তাঁরা  মুহাম্মদ সাঃ কে আল্লাহর রাসূল বলে মানে। কিন্তু তা  স্বীকার করবে না এবং ঠিক এ জন্যই তাদেরকে বোকা  বলা হয়েছে।  

বোকা লোকেরা তাদের আচরণ দিয়েই  গোপন  মনোভাব প্রকাশ করে দিচ্ছে। আর তাই আল্লাহ সুবহানা তাআলা বলছেন বোকা লোকেরা জিজ্ঞেস করবে কেন তোমরা কিবলা ফিরিয়ে নিচ্ছ?   অর্থাৎ প্রথম যে বিষয়টা আমাদের উম্মাহ হিসেবে আলাদা করেছে সেটা হলো  কিবলা পরিবর্তন।

এখানে আরেকটি বিষয় হল তখন পর্যন্ত আমরা সেই সব দিনগুলোতে রোজা রাখতাম ইয়াহুদিরা যেদিনগুলোতে রোজা রাখত। আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান আসার আগে পর্যন্ত ইহুদীরা যে সময় নামাজ  পড়তো আমরাও সেই সময় নামাজ পড়তাম।

এমনটা কেন হত?  কারণ তখনও মুছা আঃ  এর শরিয়া মানা হত।  ততক্ষণ পর্যন্ত নতুন কোন শরিয়া আসেনি, তাই যেটা আগে থেকেই ছিল আমরা সেইও শরিয়া অনুসরণ করতাম।

রাসূল (সাঃ)ও  মুসা (আঃ) এর শরিয়া অনুসরণ করতেন যতক্ষণ  পর্যন্ত না উনাকে উনার শরিয়া দেয়া হয়েছিল। আর ইহুদিরা যেদিন রোজা রাখত আমরাও সেই দিনই রোজা রাখতাম। পরে আয়াত নাযিল হলো

“সিয়াম তোমাদের মাঝে যাদের ঈমান আছে তাদের উপর সিয়াম বাধ্যতামূলক করা হলো”। “যেভাবে এটা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল তোমাদের পূর্বে যারা এসেছিল তাদের উপর” ।

আমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা  কারা ?

কারা ফরজ ইবাদত হিসেবে রোজা রাখত ?  

তাঁরা হলো ইহুদিরা,বনী ইসরাইলরা, মুসা আঃ এর  শরিয়ার অনুসারীরা।  অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানা তাআলা বলছেন যে, আমাদের পরিচয়ের একটা  অংশ হলো ইহুদিদের মতই। কিন্তু এই সূরাতে আল্লাহ্‌ সুবহানা তাআলা ইতোমধ্যে কাবা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাদেরকে আমাদের থেকে আলাদা করে ফেলেছেন।

উনি আমাদের আলাদা করেছেন আবার এখন উনি বলছেন আমাদের মাঝে সাধারণ একটা যোগ সূত্র রয়েছে।

রামাদান

আমাদের আর তাদের মাঝে যোগসূত্র হচ্ছে রোজা ।  এটা একটা সাধারন ব্যাপার। “যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো”  মজার ব্যাপার হলো সূরা বাকারার প্রথম অংশ আল্লাহ সুবহানা তাআলা ইহুদিদের কথা বলেছেন।

আর সূরা বাকারার প্রথম পুরো সময় আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগই করেছেন যে, কেন তারা তাকওয়া অর্জন করল না। পুরো সময়টাতে তাদের সমস্যা ছিল এই যে তাদের তাকওয়া ছিল না।

আর এখন আল্লাহ সুবহানা তাআলা বলছেন, “আমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারি”। আর এখন আল্লাহ সুবহানা তাআলা বলছেন, “তোমাদের কেউ সেই একই জিনিস দেয়া হলো তাদের মত যেন আমরা তাকওয়া অর্জন  করতে পারি”।

তো প্রথমে  আমি আপনাদেরকে যা করতে বলতে চাচ্ছিলাম  রোজা হচ্ছে এমন একটা জিনিস যা আমাদের পূর্ববর্তী জাতিরও ছিল, আমাদেরও আছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো আমরা কেন রোজা রাখি?

যেন আমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারি। তাকওয়া মানে হলো আল্লাহ ভীতি।  তাকওয়া শব্দটি এসেছে উকুয়া থেকে যার অর্থ হলো সুরক্ষা। সেটা আসলে কি? তাকওয়া অনেকটা ইফতিকার সাথে সমতুল্য যার অর্থ হল সুরক্ষা চাওয়া। অর্থাৎ যাতে নিজেকে সুরক্ষিত করা যায়।

এই কারণে কিয়ামতের দিন শেষ বিচারের দিনে সবাই নিজেকে সুরক্ষিত করতে চাইবে।

আল্লাহ্‌ সুবহানা তাআলা বলেছেন, “অতএব তোমরা কি রূপে আত্মরক্ষা করবে, যদি তোমরা সেদিনকে অস্বীকার কর। যেদিন বালককে করে দিবে বৃদ্ধ”  

তাই আল্লাহ সুনহানা তাআলা তাত্তাকুন শব্দটি ব্যবহার করেছেন যাতে আমরা নিজেকে সুরক্ষিত করতে পারি সেই অর্থে আর এটাই হচ্ছে তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ।  

আল্লাহ সুবহানা তাআলা বলেছেন, “আমি তোমাদেরকে রোজার বিধান দিচ্ছি যাতে তোমরা নিজেকে বাঁচাতে পারো”। আসুন এর মানে বোঝার চেষ্টা করি। প্রতিটি মানুষকে নির্দিষ্ট কিছু অনুশীলন করতে হয়।

আপনি যদি ভালো কোন কিছুতে করতে চান তাহলে আপনাকে সেই অনুযায়ী শারীরিক অনুশীলনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

রামাদান

যেমন ধরুন কেউ যদি পুলিশ অফিসার হতে চায় তখন তাদের কিছু প্রশিক্ষণ এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিছু অনুশীলন তাদের শরীরের সাথে তা অভ্যস্ত হতে শুরু করে।

যদিও শুরুরদিকে খুব কঠিন বলে মনে হয় । কিন্তু আস্তে আস্তে সেটা তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।

এই অনুশীলনের ধারণাটি আপনাকে শেখায় কিভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হয়। আরো একটি বিষয় হলো প্রশিক্ষণকালীন অনুশীলনগুলো অনেকাংশেই সহজ।  ঠিক তেমনি রোজা রাখা অবস্থায় আপনি প্রতিনিয়ত কিছু অনুভব করেন ।তাই না?

সাধারণত রোজা রাখলে প্রতিনিয়ত তৃষ্ণা অনুভব করি। আমরা প্রতিনিয়ত ক্ষুধা অনুভব করি। এমন একটি মিনিট যায়না যখন আপনি এ রকম অনুভব করেন না।

আপনার গলা পানির জন্য আপনার সাথে যুদ্ধ শুরু করে দেয়। আপনার কণ্ঠনালী যেন চিৎকার করে আপনার কাছে বলে পানি জন্য।

আপনার ভালো লাগুক আর না লাগুক আপনার গলা আপনার কাছে আবদার করতে থাকে। আর আপনি আপনার গলা কে ধমক দিয়ে বলে উঠেন,  চুপ করো!  

এখনো তো মাগরিবের আযান দেয়নি ইফতারের সময় হয়নি। আপনার পেট আপনার সাথে কথা বলতে থাকে।

অনেক সময় বেশ জোরেই বলে উঠে এই  কি হচ্ছেটা কি  উপরে খাদ্যের যোগান বন্ধ  কেন?

অনেক সময় অনেক জোরেই আপনার সাথে কথা বলে উঠে। আর আপনি বলে উঠলেন, হেই এখন মাত্র যোহর আর তুমি এখনি চিৎকার শুরু করে দিলে। এভাবে আপনি নিজেই নিজের সাথে কথা বলতে থাকলেন।  

কিন্তু আসলে জানেন কি আপনার সাথে কি হচ্ছে? আপনি যখন রোজা রাখেন ঠিক তখন আপনার ভিতরে শরীরবৃত্ত যুদ্ধ শুরু হয়। আপনার গলা, পেট আপনার বিরুদ্ধে থাকে। আপনার শরীর দুর্বল হয়ে আপনার কাছে আকুতি করে বলে, দয়া করে তুমি আল্লাহর অবাধ্য হও ।

আর আপনি যখন সারাদিন রোজা করেন ঠিক তখন আপনি আপনার শরীরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন আর বলতে থাকেন না না আমার মনের সকল ইচ্ছা আল্লাহ সুবহানা তাআলার কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। সুতরাং আমার পুরো শরীর যদিও কিছু চাই তবুও আমি তাকে সেটা দিবো না

এভাবেই যখন আপনি রোজা রাখেন তখন আপনি আপনার অন্তরকে ও শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রশিক্ষণ দেন। আপনিও এটাই করেন ঠিক আমিও তাই করি যখন আমরা রোজা রাখি।

কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ এটার  মূল উদ্দেশ্য কি? কারণ যখন রোজা শেষ হয়ে যাবে আপনার মন আপনার শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রস্তুত হবার কথা। তাই আপনি যেটা ইচ্ছা হয় সেটা খাবেন না আর যেখানে যেতে ইচ্ছা সেখানে যাবেন না।  ইচ্ছা অনুসারে এদিক সেদিক তাকাবেন না।

কারণ এইসব ইচ্ছাগুলো কার?  এই ইচ্ছা গুলো আপনার শরীরের। কিন্তু যখন আপনি রোজা করেন তখন কি আপনার শরীর ও মন অনেক শক্ত হয়। না আপনার শরীর ও মন দুর্বল হয়। আপনার মন হচ্ছে তাকওয়ার বাসস্থান। আপনি যখন আপনার শরীরকে দুর্বল করছেন ঠিক তখন আপনি আপনার মনকে শক্ত করছেন।

আপনি শিখেছেন কিভাবে বিভিন্ন কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হয়। তাই আপনাদেরকে বলছি রোজা রেখে যদি আপনি বাসায় থাকেন আর বসে বসে টিভি দেখছেন তাহলে আপনি আসলে রোজা রাখছেন না।

কারণ আপনার মন এখন আপনার ভুল আকাঙ্ক্ষা গুলোর কাছে হার মেনে গেছে। রোজা রাখার  অনুশীলনটার আসল উদ্দেশ্যটাই হলো আপনাকে প্রতিমুহূর্তে মনে করতে হবে যেভাবে আমি আমার ক্ষুধা তৃষ্ণা সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি,

 ঠিক সেভাবেই আমাকে আমার চোখ, মুখ ও জিহ্বার আকাঙ্ক্ষার সাথে লড়তে হবে।

রামাদান

আমাকে আমার হরমোনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে।

এখন কি আমাকে আমার সব কিছুর সাথেই লড়তে হবে।এর মধ্যে দৃশ্যমান হল খাওয়া আর পান করা থেকে আমাকে বিরত থাকতে হবে।

কিন্তু বাকি সবকিছুই রোজার মাঝে আছে। লা আল্লাকুম তাত্তাকুন “আশা করা যায় তোমরা আল্লাহ ভীরু হতে পারবে”।  

এই বিষয়টা যদি আমাদের মনে না থাকে তবে বনী-ইসরাঈলের সাথে আমাদের আর কোন পার্থক্য থাকে না। তারাও রোজা রাখত কিন্তু তাদের মাঝে তাকওয়া ছিল না।

আপনি কি কারনে রোজা রাখছেন সেটাই যদি ভুলে যান তবে আপনি সেটাই করছেন যা বনী ইসরাইলরা করেছিল।

আল্লাহ সুবহানা তাআলা আপনাকে বলছেন,  “বিশেষত তোমাদের উপর, এখন তোমাদের পালা।

আমি তোমাদের তাই দিচ্ছি যা আগের প্রজন্মের ওদেরকেও দিয়েছিলাম। তারা এর থেকে কোন উপকার পাইনি।

তারা  তাকওয়া অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে”। আল্লাহ্‌ সুবহানা তাআলা যখন আমাদের উপর রোজা ফরজ করেছেন আমরা যখন রোজার কথা চিন্তা করি ঠিক তখন কোন জিনিসটা আমাদের মাথা প্রথম আসে। তা হলো ইফতারের কথা।

সুতরাং ইফতারের কথা চিন্তা করেই আমরা রোজা রাখছি।

বাস্তব জীবনে কঠিন সময় মোকাবেলা করার জন্য আপনার প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময়ে সেটা অনেক সহজ হয়ে থাকে।

তবে আল্লাহ সুবহানা তাআলা কি করছেন!  আল্লাহ রমজানের রোজা কি আপনার জন্য সহজ করে দেননি?  উনি রমজানে শয়তানকে বন্দি করে রাখেন।

তিনি শয়তানকে আমাদের থেকে  অনেক দূরে সরিয়ে রাখেন। উনি আমাদের কাজকে অনেক সহজ করে দেন।

যাতে আমাদের অন্তর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটা সুযোগ পায়। আমরা যেন নিজেরদের অন্তরকে নিয়ন্ত্রণ মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি লাভ করতে পারি।

আগামী পর্বে আমরা ক্ষমার এই মাস রামাদান নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ্‌।

FAQs About Ramadan – রোজা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন

রমজান অর্থ হচ্ছে, “তাকওয়া” অর্থাৎ তাকওয়ার সাথে সিয়াম পালন করা।

আত্মসংযম করা, জালিয়ে দেয়া।

যেন আমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারি। তাকওয়া মানে হলো আল্লাহ ভীতি।  তাকওয়া শব্দটি এসেছে উকুয়া থেকে যার অর্থ হলো সুরক্ষা। সেটা আসলে কি? তাকওয়া অনেকটা  ইফতিকার সাথে সমতুল্য যার অর্থ হল সুরক্ষা চাওয়া। অর্থাৎ যাতে নিজেকে সুরক্ষিত করা যায়।

মুসলিমরা হল, হযরত ইসমাইল (আঃ) এর সন্তান। এবং ইয়াহুদিরা হল, ইসহাক (আঃ) এর সন্তান।

ইয়াহুদিরা ও আমাদের মত রোজা রাখতো। কিন্তু তাদের তাকওয়া ছিলনা। কিন্তু মুসলিম রা রোজা রাখে এবং পরিপুর্ন তাকওয়ার সাথে রাখার চেষ্টা করে।

এখন কেউ যদি সারাদিন রোজা রাখল এবং টিভি দেখলো, তবে তাদের আর আমাদের রোজায় কোন পার্থক্য থাকবেনা। কারন তখন আপনি শয়তানের কাছে হার মেনে গেলেন এবং আপনার তাকওয়া ও নষ্ট হয়ে গেল।

না, কোন পার্থক্য নেই, কারন তাঁরা সবাই ইব্রাহীম (আঃ) এর সন্তান। আর ইব্রাহিম (আঃ) এর ২ সন্তান থেকেই তাঁরা আসছে। তাই মূলত এর মাঝে কোন পার্থক্য নেই।