ভালবাসার অপর নাম ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাঃ) | story of muhammad SAW

853
রাসুলাল্লাহ (সাঃ)
রাসুলাল্লাহ (সাঃ)

ভালবাসার অপর নাম ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাঃ)

কখনো দেখিনিযে মানুষটাকে, কখনো শুনিনিযে মানুষটির কন্ঠস্বর,যে মানুষটির পবিত্র সান্নিধ্যে উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য কখনো হয়নি, আমার আর যে মানুষটা মাঝে চৌদ্দশ বছরেরও বেশি সময়ের ব্যবধানে সে মানুষটা কেমন করে যে আমার এত আপন হয়ে গেল?
যারা বোঝতে চায় না যে ২১ শতাব্দীতে বসবাস করা শত কোটি মানুষ, মধ্যযুগের আরবসমাজের একজন ব্যক্তির জন্য এতটা টানকিভাবে অনুভব করে?

তাদেরকে কি করে বুঝাবো আপনাকে কেন এত ভালোবাসি? ইয়া রাসুলুল্লাহ!
আপনাকেস্মরণ করে আজ শত কোটি হৃদয় ভালোবাসায় ভরে উঠুক।

প্রতিটি ক্ষণে পৃথিবীর কোন না কোন যায়গায় আপনার প্রশংসা উচ্চারিত হয়।
অথচ আপনি যখনআলোকরশ্মি ছড়িয়ে পৃথিবীর বুকে আপনার জন্ম হয়তখন আপাতদৃষ্টিতে আপনি ছিলেন অনেকটাই নিসঙ্গ, অসহায়।

আপনার জন্মের আগেইআপনার বাবা আব্দুল্লাহ ফিরে গেলেন আল্লাহর সুবহানা তাআল্লার কাছে।আপনার বয়স৬ হতে না হতেই আপনি মা আমিনাকেহারালেন।

জীবনের সবকিছু যে মাকে কেন্দ্র করেই, সেই মা চলে যাওয়ার মানে কি তা তখনও আপনার মতো নিষ্পাপ শিশুটিবুঝতে পারছিলেন না?

আপনিও অসহায় কন্ঠে বারাকাকে জিজ্ঞেস করলেন, মায়ের কি হয়েছে বারাকা?
বারাকা কি করে আপনাকে বোঝাত আপনি কি হারিয়েছে?

সে আপনাকে জড়িয়ে ধরে রাখলো। সে অসহ্য উষ্ণ অশ্রুধারায় সিক্ত হল আপনার মুখমণ্ডল। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই যে দাদা আপনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন সেই আবদুল মুত্তালিব ইন্তেকাল করলেন বছরখানেক পর।

আপাতদৃষ্টিতে এ পৃথিবীর বুকে৮ বছরের সেই নিস্পাপ বালকটির যেন ছিল সবচেয়ে একা,অসহায়ও বঞ্চিত।

কিন্তু বাস্তবে আপনার রব আপনার জন্যএমন এক বিস্ময়কর অভিযান প্রস্তুত করে রেখেছিলেন,যার দিপ্তপ্রভা স্থান-কালের বাধার ছেদ করে ছড়িয়ে পড়বে সর্বত্র।
অনেক বছর পর আপনার রব আপনার যখন আপনার কাছে আয়াত নাজিল করে বলেন,
وَالضُّحَىٰ
অদ্ব্দ্বুহা
১) উজ্জ্বল দিনের কসম।

وَاللَّيْلِ إِذَا سَجَىٰ
অল্লাইলি ইযা- সাজ্বা
২) এবং রাতের কসম যখন তা নিঝুম হয়ে যায়।

مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَىٰ
মা অদ্দা‘আকা রব্বুকা অমা- ক্বলা
৩) ( হে নবী !) তোমার রব তোমাকে কখনো পরিত্যাগ করেননি এবং তোমার প্রতি অসন্তুষ্টও হননি।

وَلَلْآخِرَةُ خَيْرٌ لَّكَ مِنَ الْأُولَىٰ
অলাল্ আ-খিরাতু খাইরুল্লাকা মিনাল্ ঊলা
৪) নিসন্দেহে তোমার জন্য পরবর্তী যুগ পূর্ববর্তী যুগের চেয়ে ভালো।

وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَىٰ
অলাসাওফা ইয়ু’ত্বীকা রব্বুকা ফার্তাদ্বোয়া
৫) আর শীঘ্রই তোমার রব তোমাকে এত দেবেন যে , তুমি খুশী হয়ে যাবে।

أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَىٰ
আলাম্ ইয়াজ্বিদ্কা ইয়াতীমান্ ফাআ-ওয়া
৬) তিনি কি তোমাকে এতিম হিসেবে পাননি? তারপর তোমাকে আশ্রয় দেননি?

وَوَجَدَكَ ضَالًّا فَهَدَىٰ
অওয়াজ্বাদাকা দ্বোয়া-ল্লান্ ফাহাদা
৭) তিনি তোমাকে পথ না পাওয়া অবস্থায় পান, তারপর তিনিই পথ দেখান।

وَوَجَدَكَ عَائِلًا فَأَغْنَىٰ
অওয়াজ্বাদাকা ‘আ-য়িলান্ ফাআগ্না
৮) তিনি তোমাকে নিঃস্ব অবস্থায় পান, তারপর তোমাকে ধনী করেন।

فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ
ফাআম্মাল্ ইয়াতীমা ফালা-তাক্বরর্হা
৯) কাজেই এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না।

وَأَمَّا السَّائِلَ فَلَا تَنْهَرْ
অআম্মাস্ সা-য়িলা ফালা-তার্ন্হা
১০) প্রার্থীকে তিরস্কার করো না।

وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ
অ আম্মা-বিনি’মাতি রব্বিকা ফাহাদ্দিছ্
১১) আর নিজের রবের নিয়ামত প্রকাশ করো।

আপনাকে এই পৃথিবীর বুকে একাকি করে দিয়েছিলেন আপনার রব। যেন তিনি একমাত্র, তিনিই তাঁর পবিত্র ভালোবাসা আর মমতায় আপনাকে লালন পালন করতে পারে।

কি অপূর্ব সেই ভালোবাসা!কি অপরূপ সেই প্রতিপালন।

মহান আল্লাহর তাআলার বিশেষ রহমতের ছায়া তলে বেড়ে ওঠা আপনি তাই কখনো শির্কের ধোকার শিকার হননি, তারুণ্যের সেই যাযাবর সময়টাতেও আপনি ছিলেন সব ধরনের অপকর্মের ঊরধে।

আপনার চরিত্রে সবাই এতটাই মুগ্ধ ছিল যে আপনার বিশ্ততায় সবার এত আস্থা ছিল, যে তারা আপনাকে নাম ধরে না ডেকে,ডাকতলাগল আল আমিন মানে বিশ্বস্ত ব্যক্তি।

অনেকবছর পর আপনি যখন সত্যের পথে আহবান করা শুরু করে দিয়েছিলেন এবং আপনার বিরোধিতা করা মানুষের অভাব ছিল না। এমনকি তারা আপনাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করছিল।তাদের ধন-সম্পদও আপনারই ঘরেই ছিল।

তারা আপনাকে হত্যা করতে এসে দেখল যে সেখানে নেই। আপনার বদলে তাঁরা সেখানে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু আছেন। তখন আলি তাদেরকে বলেছিলেন, আপনি তাকে শেখানে রেখে গেছেন যেন তিনি তাদেরকে যার যার সম্পদ তাকে তাকে বুঝিয়ে ফেরত দিতে পারেন।

অর্থাৎ যে ব্যক্তিটি আপনাকে হত্যা করার পরই পরিকল্পনা করছিলো তার সম্পদ নিরাপদে রাখার সর্বশ্রেষ্ঠ জায়গা ছিল আপনারই নিজের ঘর।

যারাআপনাকেসবার সামনে মিথ্যুক আর জাদুকর বলেছে তাদের মধ্যেও সব সময় আপনি ছিলেনআল-আমিন অর্থাৎ বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। আপনার চরিত্র আর ব্যবহার এত মনমুগ্ধকর ছিল যে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা আপনার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন,”নিঃসন্দেহে আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের চূড়ান্তে”

তরুণ বয়সে আপনার যে উপস্থিত বুদ্ধি ছিল সেগুণেই আপনি একদিন বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নেতা হিসেবেরূপান্তরিত হলেন।

যেদিনকোন বংশের লোকেরাকাবা শরীফের কালো পাথর বসিয়ে দেবে তা নিয়ে বিরাট রেষারেষি শুরু হয়ে গিয়েছিল সেদিন তারা আপনাকে আসতে দেখি বলল, ওই যে আলামিন আসছে ও যা সমাধান দিবে সেটাই হবে।

আপনি সেইমুহূর্তের এমন প্রস্তাব দিলেন যে সকলে তা মেনে নিল। একটি বড় কাপড়ের মাঝখানে কালো পাথরটিরেখে কাপড়টির বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিটি বংশের একজন প্রতিনিধি শক্ত করে ধরে রাখলো

এবং সবাই মিলে পাথরটিকে কাবার একেবারে কাছে নিয়ে গেল এবং পরিশেষে সবার নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে কাপড় থেকে পাথরটি তুলে আপনি নিজ হাতে কাবার সেই গর্তে বসিয়ে দিলেন।

মানুষের মধ্যে বিভেদ দূর করে দেয়ার আপনার এই গুন বিস্মিত করেছে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল স্তরের বুদ্ধিজীবীদের।

ইয়া রাসূল আল্লাহ! আপনাকেকিভাবে না ভালোবেসেথাকব?আপনার মুখে যে সব সময় এক মন ভুলানো হাসিছিল।

আপনার সেই অপরূপ হাসিমুখআপনি যার সাথে কথা বলতেন তাকে উপহার দিতেন ।আপনি কখনো মুখ খুলে উচ্চ স্বরেহাসতেন না কিন্তু আপনার মুখের মার্জিত সুমধুর সেই মুচকি হাসিটি সাদা বিরাজমান ছিল।

কখনো কখনো আপনি একটু হাসি ঠাট্টা করতে ভুলবেন না! একদিন যখন একজন বৃদ্ধ সাহাবী এসে আপনার কাছে জানতে চেয়েছিল তিনি কি জান্নাতে যেতে পারবেন ? আপনি তাকে বলেছিলেন, জান্নাতে কোন বৃদ্ধ মানুষ যাবে না।

আতঙ্কে যেইনা তিনি কাঁদতে শুরু করলেন,ঠিক তখনই আপনি হেসে তাকে শান্ত করে বললেন, যে ব্যক্তি জান্নাতে যাবে সেই ব্যক্তি তারযৌবনকালে ফিরে যাবে।

আপনার ঠাট্টার সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব ছিল যে, আপনি মজা করেও কখনো কোন মিথ্যা কথা বলতেন না।

আপনাকে দেখারসৌভাগ্য যাদের হয়েছিল তাদের কেউ কেউ আপনাকেতুলনা করেছেসূর্যের সাথে, কেউ কেউতুলনা করেছে চাঁদের সাথে, তাদের শব্দ তালিকায় এর চাইতে আরো সুন্দর শব্দ থাকলে তারা হয়তো সেই শব্দটি উল্লেখ করত।

আপনার শরীরেরঘ্রাণ ছিল খুবই মনমুগ্ধকর। আপনার সুন্নাহ ছিল অধিক পরিমানে সুগন্ধি ব্যবহার করা। যদিও আপনার ঘামের সুবাস ছিল সুগন্ধি চেয়েও মিষ্টি।

খুব আপন মানুষ গুলোর ঘামেথাকে এক অন্যরকম মিষ্টত্ব। যে ব্যক্তি হাবিবুল্লাহ অর্থাৎ স্বয়ং আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা তার ঘামে যে এক অলৌকিক সুভাষ থাকাটা তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে?

জাতি, বর্ণ, সামাজিক ও আর্থিক অবস্থা নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের সাথে আপনার আচরণ ছিল অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ।

আপনি কারো সাথে কথা বললে শুধু মাথাটা তার দিকে ঘুরিয়ে কথা বলতেন না বরং আপনার পুরো শরীরটা তার দিকে ঘুরিয়ে তাকে সম্মান দেখিয়ে তার সাথে কথা বলতেন।

কোন দিকে ইশারা করতে হলে অঙ্গুল দিয়ে ইশারা করতেন না বরং পুরো হাত দিয়ে ইশারা করতেন । কোন মানুষের প্রকৃত চরিত্র বোঝার জন্য দেখা উচিত সে তার অধীন বাস্তবের সাথে কেমন আচরণ করে।

আনাস ইবনে মালিক ছোট বয়সেই আপনার খেদমতে নিয়োজিত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ১০ বছর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে করি।তিনি আমাকে একটি বারওবকা দেননি। বরং যখন উম্মে হা তাল মুহমিনিন অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীরা কেউ আমাকে বকা দিতে যেতেন তিনি তাদেরকে নিষেধ করতেন।

যাইদ রাঃ তাআলা যখন দাস হিসেবে আপনার ঘরে ছিলেন এবং তার নিজের পরিবার তাকে খুঁজে পায় এবং আপনি তাকে অনুমতি দেন যে তিনি চাইলে আপন পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারে ।

যাইদ নিজ পরিবারকে অবাক করে বলেছিল

আমি এই মানুষটাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না!

যাইদ এর বাবা বিক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিল,

তুমি কি পাগল হয়ে গিয়েছো?

একজন স্বাধীন মানুষ হয়ে নিজের পরিবারের সাথে না থাকে তুমি তাকে সারা জীবন দাস হয়ে কাটিয়ে দিতে চাইছো।

তখন যাইদ বলেছিল,আমি এই মানুষটার মাঝে এমন কিছু দেখেছি যে আমি আর কাউকে আর তার উপর প্রাধান্য দিতে পারবনা।